ব্রেকিং নিউজ

বিদেশ থেকে অধিক চাল আসায় দেশের কৃষকদের সর্বনাশ

Image result for চাল

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ; অথচ বোরোর ভরা মৌসুম শুরুর আগে চাল আমদানী করা হয়েছে। বিপুল পরিমান চাল আমদানী করায় পড়ে গেছে ধানের দাম। বিপাদে পড়ে গেছে কৃষকরা। এখনও চাল আমদানি হচ্ছে ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশ থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৮ সাল নির্বাচনের বছর হওয়ায় সরকার কৃষকের স্বার্থের বদলে ‘খাদ্য উদ্বৃত্ত রাখতে’ চালের মজুুদ বৃদ্ধির কৌশল নিয়েছে। অথচ বিদেশ থেকে অধিক চাল আসায় দেশের কৃষকদের হয়ে গেছে সর্বনাশ।

বোরো ধান কাটার মৌসুম প্রায় শেষ। সারাদেশে ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। এক মণ ধান উৎপাদনে প্রায় ৭শ’ টাকা খরচ হলেও এলাকা ভেদে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা দরে। অথচ সরকার প্রতি মণ ধানের মূল্য বেঁধে দিয়েছে ১ হাজার ৪০ টাকা। সরকার কৃষিবান্ধব প্রমাণের চেষ্টা করলেও বাস্তবতা হলো খাদ্য মন্ত্রণালয় কৃষকের কাছ থেকে তেমন ধান কিনছে না। অপরদিকে এই ধান মজুদ রাখার পর্যাপ্ত জায়গা নেই কৃষকের। সারাদেশে থেমে থেমে প্রতিদিনই ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। অনেক কৃষক জমি লিজের, সেচের, সার ও কীটনাশকের টাকা যোগান দিতে পারছে না। ধার দেনা করে মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে ধান চাষ করেছিল। এই সুদের টাকাও দিতে হবে। তাই কৃষক উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়েই ধান বিক্রি করতে গিয়ে প্রতি মণ ধানে ২শ’ থেকে আড়াইশ’ টাকা লোকসান গুণছে। আর তাই গ্রামের হাট-বাজারগুলোতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ধানই কৃষকের সর্বনাশ করেছে। অনেক কৃষকের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। অথচ ভরা মৌসুমে ভারত থেকে চাল আমদানি চলছেই। গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চাল আমদানি হয়েছে ১৫ লাখ ৪৬ হাজার ২৩৫ মেট্রিক টন। এই সময়ে নতুন করে চাল আমদানির জন্য এলসি (লেটার অফ ক্রেডিট) খোলা হয়েছে ১১ লাখ ৫৫ হাজার ৬৮৫ মেট্রিক টনের। এদিকে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার পরেও ভালো দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষকই যে উৎপাদন বিমুখ হয়ে পড়ছেন, সে কথা স্বীকার করেছেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামও। এ কারণে ভোক্তাদের পাশাপাশি কৃষকদের স্বার্থের কথাও বিবেচনায় রাখতে সবার প্রতি আহŸান জানিয়েছেন তিনি।

এ বছর বোরো ধানের বাম্পার ফলনের পূর্বাভাস ছিল আগে থেকেই। পূর্বাভাস অনুযায়ি প্রত্যাশিত ফলনও হয়েছে। কিন্তু গতবছর হাওড় অঞ্চলে বন্যা ও বøাস্ট রোগের কারণে দেশে ধান উৎপাদন কম হওয়ায় সরকার ভারত, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। চালের বাজার সহনীয় রাখতে আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে দেয় সরকার। পাশাপাশি শূন্য মার্জিনে চাল আমদানিরও সুযোগ দেয়া হয় ব্যবসায়ীদের। এতে এক লাফে বেড়ে যায় পণ্যটির আমদানি, যা দেশের খাদ্যশস্য আমদানির চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। চলতি অর্থবছরের ১৫ মে পর্যন্ত দেশে রেকর্ড ৯২ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে। যার মধ্যে চালই ৩৮ লাখ ৩৭ হাজার টন। অতিরিক্ত আমদানি বিপাকে পড়েছে দেশের কৃষক। দেশের হাওর অঞ্চলসহ অধিকাংশ এলাকায় ধান কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে। সরকার ন্যায্য মূল্যে ধান ক্রয়ের আশ্বাস দিলেও পর্যাপ্ত মজুদ দেখিয়ে ধান কিনছে না। অথচ গত বছর অনেক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় কৃষকদের জন্য সরকার নানা পরিকল্পনা নিয়েছিল। কিন্তু বছর যেতে না যেতেই তার কোন বাস্তবায়ন নেই। কৃষক ৫ মাস পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ধান উৎপাদন করে এখন অর্ধেক দামে বিক্রি করছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, গত ১৪ মে পর্যন্ত সরকার মাত্র ১৭ হাজার ৩৫৩ টন ধান সংগ্রহ করেছে। এই মৌসুমে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার টন। আর সরকার যখন ন্যায্য মূল্যে ধান ক্রয় বাড়িয়ে দিবে তখন কৃষকের হাতে ধান থাকবে না। মহাজনদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করতে হবে। আর সরকারের দেয়া কৃষকের সুবিধা ভোগ করবে মহাজন। অথচ অনেক কৃষকই আশায় বুক বেধে পরিশ্রম করেছিলেন বাম্পার ফলনের মাধ্যমে গতবারের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু ধানের সঠিক দাম না পাওয়ায় হতাশ তারা। আবার লোকসানের মুখে পড়েছেন সারাদেশের কয়েক লাখ কৃষক।

যদিও সরকারের চাল আমদানির সিদ্দান্তের সময়েই বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছিলেন, দেশে বিদ্যমান চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে সরকারের খাদ্য মজুদ বেশ সন্তোষজনক। এ অবস্থায় ফসলহানির পরিমাণ ও কৃষকস্বার্থ বিবেচনা করে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে সাময়িকভাবে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ভোক্তার কোনো কাজেই আসবে না। অবিবেচনাপ্রসূত কোনো সিদ্ধান্তে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হলে পরবর্তী মৌসুমের উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়বে। কিন্তু কে শুনে কার কথা।

এ বছর আগে থেকেই ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউট ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলে আসছে, ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। অথচ এখনও আমদানি হচ্ছে ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশ থেকে চাল। এ ধরনের আত্মঘাতি সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছে কৃষক।

ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর ইনকিলাবকে বলেন, এ বছর প্রথমবারের মতো বোরো চালের উৎপাদন ২ কোটি মেট্রিক টন ছাড়াবে। গত বছর ছিল ১৮০ কোটি মেট্রিক টন। ২০১৬ সালে ছিল ১৯১ কোটি মেট্রিক টন। একই সঙ্গে এ বছর ধানে বøাস্ট রোগ ছড়িয়ে পড়ার উপযোগী আবহাওয়া ছিল। কিন্তু বøাস্ট রোগ সম্পর্কে কৃষকদের সচেতনতাসহ ২ লাখ লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। তাই বড় কোন ক্ষতির মুখে পড়তে হয়নি। সর্বসাকুল্যে আড়াই হাজার মেট্রিক টন চাল কম উৎপাদন হতে পারে। তিনি জানান, চালের উৎপাদন আরও বাড়াতে ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউট উদ্ভাবিত বি হাইব্রিড ধান৫ এর চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে কৃষককে। এই ধান চাষ করলে ফলন একরপ্রতি ২০ শতাংশ উৎপাদন বাড়বে।

সূত্র মতে, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে চলতি বছর বোরো মৌসুমে ৩৮ টাকা কেজি দরে চাল এবং ২৬ টাকায় ধান কেনার সিদ্ধান্ত জানান। এই হিসাবে বোরো চাষিরা সরকারের কাছে ধান বিক্রি করে গতবারের তুলনায় কেজিতে দুই টাকা বেশি দাম পাবেন। আর মিল মালিকরা সরকারের কাছে এবার চাল বিক্রি করে পাবেন গতবারের চেয়ে চার টাকা বেশি। সরকারিভাবে ২ মে থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই ধান ও চাল সংগ্রহ করার কথা জানান খাদ্যমন্ত্রী। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি ধান কেনার ঘোষণা আসলেও নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি না হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ি, কেজি প্রতি ২৬ টাকা দরে ধান কিনলে কৃষক প্রতি মন ধানে পাবে ১ হাজার ৪০ টাকা। অথচ কৃষক বর্তমানে ১ মণ ধান বিক্রি করে পাচ্ছে ৬০০ থেকে ৬৫০টাকা। অথচ প্রতি মণ ধান উৎপাদনে প্রতি কৃষকের উৎপাদন খরচ ৭শ’ টাকার উপরে। হিসেবে মতে, ধান বিক্রি করে লাভ তো দুরের কথা উৎপাদন খরচই উঠাতে পারছেনা কৃষক।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেবে মতে, এ বছর কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৫০ হাজার টন। এই ধানে এক লাখ টন চাল পাওয়া যাবে। পাশাপাশি মিলারদের কাছে থেকে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ টন চাল (সিদ্ধ ও আতপ)। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৮৮৩ টন চাল সংগ্রহ করা হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন এলাকার ইনকিলাবের প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদের ভিত্তিতে দেখা যায়, অনেক আশা নিয়ে বোরো ধানের চাষ করেছিল কৃষকরা। সোনালী ধান ফলাতে চাষীরা উচ্চ মূল্যে বীজ, সার, ডিজেল, কীটনাশকসহ নানা উপকরণ ক্রয় করে। ধানের দাম কম হওয়ায় আবারও লোকসানের মুখে পড়তে যাচ্ছে কৃষক। কৃষকদের দাবি, অকাল বন্যায় গত বছর ফসল ভেসে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। আর এ বছর জমিতে অধিক ফলন উৎপাদন হলেও বাজারে ন্যায্য দাম না থাকায় আবারও লোকসানে পড়ছেন। অল্পতেই তুষ্ট হওয়া এসব মানুষের মুখের হাসি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। লোকসান যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না তাদের। ফলে কৃষকের ঘাড়ে বাড়ছে দেনার বোঝা। কারণ দৈনন্দিন খরচ মেটাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন গ্রামের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় কোন ক‚লকিনারা পাচ্ছেন না অনেকে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং লোকসানের কারনে অনেকেই আবার কৃষি পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। এছাড়া প্রতি বছর নানা কারণে কমে যাচ্ছে আবাদি জমির পরিমাণ। অনেকে আবাদ করা ছেড়ে দিয়ে জমি পতিত রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অঞ্চলভেদে গ্রামগুলোর চিত্র ভিন্ন হলেও গ্রামে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষ অস্থিরতা ও উৎকন্ঠার মধ্যে দিন পার করছেন। এদিকে গ্রামের লাখ লাখ দরিদ্র মানুষ আটকা পড়েছেন সুদ বাণিজ্যের বেড়াজালে। দৈনিক ও সাপ্তাহিক কিস্তিতে বিভিন্ন এনজিও’র সুদাসল পরিশোধের সুযোগ থাকায় অভাবী মানুষগুলো এনজিওর কাজ থেকে ঋণ গ্রহণের পর পড়ছে মহাবিপাকে। ঋণগ্রহিতারা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত হওয়ায় অনেককে শেষ পর্যন্ত বাড়ি ভিটে হারা হয়ে সর্বস্বান্ত হতে দেখা গেছে। দেশের অধিকাংশ কৃষকের হাসিমুখ মলিন হতে চলেছে। বিভিন্ন শষ্য উৎপদন করে খরচই উঠছে না। অর্থ সংকট সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিচ্ছে তাদের।

কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের সাবেক পরিচালক কৃষিবিদ চৈতন্য কুমার দাস ইনকিলাবকে বলেন, দেশের প্রচলিত ব্যবস্থায় কৃষকের ভাগ্য ফেরানো সম্ভব নয়। কৃষককে সুবিধা দিতে হলে তার পণ্য সংরক্ষনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রত্যেকটি এলাকায় সংরক্ষণাগার তৈরি করে শষ্য রাখার সুযোগ দিতে হবে। যাতে সুবিধামতো সময়ে কৃষক তা বিক্রি করতে পারে। একই সঙ্গে পণ্য বিক্রির একটি সঠিক প্রক্রিয়া তৈরি করতে হবে যাতে কোন মধ্যস্বত্তভোগী না থাকে। কৃষকের কাছ থেকেই সরকার পণ্য ক্রয় করবে। এটা করতে না পারলে কৃষকের দুর্দশা লেগেই থাকবে বলে উল্লেখ করেন চৈতন্য কুমার দাস। দেদারছে আমদানির বিষয়ে তিনি বলেন, কি পরিমান আমদানি করা হবে এ নিয়ে পরিকল্পা করা উচিত ছিল সরকারের। একই সঙ্গে এ বছর নির্বাচনের বছর। তাই সরকার যাতে কোন সমস্যায় না পড়ে সে জন্য বেশি করে আমদানি করছে। এক্ষেত্রের কৃষকের স্বার্থ দেখার কিছু নেই বলে মনে হচ্ছে।

Spread the love

Related posts