রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে মূলধন না দেয়ার সুপারিশ সংসদীয় কমিটির

Image result for সরকারী ব্যাংক

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দ দেয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে বলেছে সংসদীয় কমিটি, যা নিয়ে এর আগে সংসদেও সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। সংসদের অনুমিত হিসাব কমিটির একটি উপকমিটি এ সুপারিশ করেছে। গতকাল সংসদীয় কমিটির বৈঠকে ২৩ দফা সুপারিশের একটি প্রতিবেদন জমা দেয় ওই উপকমিটি।

বেসরকারি ব্যাংকে প্রভিশন রাখার বাধ্যবাধকতা শিথিল করা, অগ্রণী ব্যাংকের ২৩ জন গ্রাহকের ঋণ এবং বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের ওপর পরবর্তী করণীয় গ্রহণের সুপারিশ করার জন্য গত বছরের ২২ নভেম্বর ওই কমিটি করা হয়। তিন সদস্যের উপকমিটির আহ্বায়ক ছিলেন কুমিল্লা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন। অন্য সদস্যরা হলেন ঢাকা-১০ আসনের শেখ ফজলে নূর তাপস ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য ওয়াসিকা আয়শা খান।

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে গতকাল জমা দেয়া প্রতিবেদনে উপকমিটি ২৩টি সুপারিশ উপস্থাপন করেছে। তাদের সুপারিশে বলা হয়েছে, যেসব গ্রাহকের ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে কোনো সহায়ক জামানত নেই বা অপর্যাপ্ত সহায়ক জামানত রয়েছে, ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে সেসব গ্রাহকের অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি সংযুক্ত করতে হবে।

ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে যেসব মামলার কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ রয়েছে, সে বিষয়ে উপকমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশ নিয়ে এসব স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করে মূল মামলার কার্যক্রম দ্রুত চালু করতে হবে। সেই সঙ্গে গ্রাহক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলার কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারক করতে হবে।

যেসব গ্রাহক এলসি দায় পরিশোধ করেনি, অবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিধিতে মামলা করা এবং মামলা কার্যক্রম ও ঋণ আদায়ের অগ্রগতি ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অডিট কমিটি কর্তৃক মনিটরিং করতে হবে বলেও সুপারিশ দিয়েছে উপকমিটি।

সুপারিশে আরো বলা হয়েছে, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকের গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের ঋণ হিসাবে সংঘটিত অনিয়মের জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রচলিত চাকরি প্রবিধানমালার নির্দেশনা মোতাবেক তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিধিতে মামলা করতে হবে।

উপকমিটির অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে— ভবিষ্যতে কোনো অনুমোদিত ঋণের বিপরীতে অর্থ প্রদানের আগে উপযুক্ত মূল্যের জমি অথবা অন্যান্য সিকিউরিটি যথাযথভাবে ব্যাংকের নামে রেজিস্ট্রি করতে হবে। বেসিক ব্যাংক ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে যেসব গ্রাহককে ঋণ দিয়েছে, সেসব গ্রাহকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ঋণ আদায়ের স্বার্থে প্রয়োজন হলে দুদকের মাধ্যমে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার অনুশাসন দেয়া যেতে পারে। চেকের বিপরীতে ঋণদান এবং এলটিআরের বিপরীতে এলসি প্রতিষ্ঠিত না করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। অ্যাকোমোডেশন বিলের মাধ্যমে গ্যারান্টার হওয়ার প্রক্রিয়ায় ঋণ নেয়া বন্ধ করতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআইসি রিপোর্ট অবজ্ঞা করে যাতে ঋণ না দেয়া হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। বোর্ড বহির্ভূত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন যেন না হয়, তাও নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বেসরকারি ব্যাংকের প্রভিশন রাখার বাধ্যবাধকতা শিথিল করা আইনানুগ হয়নি মন্তব্য করে ভবিষ্যতে পুনরায় প্রভিশন রাখার বাধ্যবাধকতা শিথিল না করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় উপকমিটি।

সংসদ সচিবালয় থেকে জানানো হয়, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কমিটির সুপারিশমালা অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে লোকসান হওয়ার ফলে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে সরকারকে জাতীয় বাজেট থেকে বরাদ্দের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের জন্য প্রায়ই ব্যাংক অনুরোধ করে। এ ধরনের ঘাটতি পূরণের প্রবণতা বন্ধ করতে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব ক্ষেত্রে মূলধন ঘাটতি পূরণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে, সেসব ক্ষেত্রে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের শর্তসাপেক্ষে ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে।

বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য আবদুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেন, মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদনটি পাঠানো হবে। তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। মূলধন সরবরাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য আবদুর রাজ্জাক, এবি তাজুল ইসলাম, ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন, শাহানারা বেগম এবং এটিএম আব্দুল ওয়াহহাব।

Spread the love

Related posts