ব্রেকিং নিউজ

চিলিতে রোমান ক্যাথলিক গির্জার ৩০ জন সদস্যের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ

Image result for গির্জা

চিলির কর্তৃপক্ষ সেদেশের রোমান ক্যাথলিক গির্জার ৩০ জন সদস্যের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করছেন। বলা হচ্ছে, এই ধর্মীয় নেতারা হয় যৌন নির্যাতন করেছেন, না হয় অভিযোগ ধামা চাপা দিয়েছেন।

২০০০ সাল থেকে রোমান ক্যাথলিক গির্জার এসব নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এখন পর্যন্ত ২৬৬ জন, যাদের ৬৭ শতাংশই শিশু, অভিযোগ করেছে তারা পাদ্রী, বিশপদের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

কর্তৃপক্ষ এখন তদন্ত শুরু করেছে।

এমনকী চিলির ক্যাথলিক গির্জার প্রধান কার্ডিনাল রিকার্ডো এজ্জাতির ওপর কলঙ্কের দাগ পড়েছে। সম্প্রতি এক বিচার বিভাগীয় তদন্তে বলা হয়েছে, কার্ডিনাল যৌন নির্যাতনের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

এ বছরের গোঁড়ার দিকে চিলির ৩৪ জন বিশপকে রোমে ডেকে এনে পোপ ফ্রান্সিস “নির্যাতন এবং ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতির” তীব্র নিন্দা করেন। পাঁচজন বিশপ তখন পদত্যাগ করেন।

বিবিসির কনস্তানজা ওলা গির্জা স্কুলের দুজন প্রাক্তন ছাত্রের সাথে কথা বলেছেন যারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন। যে পাঁচ বিশপ পদত্যাগ করেছেন তাদের অন্যতম গোনজালো দুয়ার্তের সাথেও কথা বলেন বিবিসির সংবাদদাতা।.

মরিসিও পালগার

১৯৯৩ সালে একটি ক্যাথলিক যুব দলের সদস্য ছিলেন মরসিও পালগার। চিলির মধ্যাঞ্চলের একটি ছোট শহরে এক প্রার্থণা সভার জন্য তাকে ডাতা হয়েছিল। ফাদার ‘এম’ (ছদ্মনাম) সেই অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন।

এক রাতে ঐ পাদ্রী তাদের জামা কাপড় খুলে সুইমিং পুলে নামতে বলেন।

“আমি এবং আমার এক বন্ধু অস্বীকার করি, কিন্তু ফাদার এম আমাদের ওপর জবরদস্তি শুরু করেন, তিনি বলেন, আমরা নগ্ন হচ্ছিনা কারণ আ‌মাদের যৌন রোগ আছে,” বিবিসিকে বলেন মরিসিও পালগার।

“এরপর ফাদার এম সুইমিং পুলে নেমে আমাদের গায়ে হাত দেওয়া শুরু করেন। তিনি বলেন, সম্পর্কে আস্থা তৈরির জন্য, মর্যাদাবোধের জন্য এটা ভালো।।”

ফাদার এম একদল ছাত্রকে নগ্ন হয়ে সুইমিং পুলে নামতে বাধ্য করেছিলেন।

দুমাস পর, পাদ্রি হওয়ার জন্য পড়াশোনা শুরু করেন মরিসিও। তিনি বলেন, গির্জার সেই স্কুলেও তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

“তারা পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরতো..বাঁধা দিলে রেগে যেত।”

“চুম্বন করতে না দিলে তারা গালিগালাজ শুরু করতো।”

ফাদার ‘এইচ’ (ছদ্মনাম) নামে আরেক পাদ্রীর সাথে যন্ত্রনাকর অভিজ্ঞতার কথা বলেন মরিসিওি। কাছেরএকটি শহরে ঐ পাদ্রিকে কিছু কাজে সাহায্য করছিলেন।

“তিনি আমাকে বলেন, কেন আমি সম্পর্ক করতে উদ্যোগী হচ্ছিনা? আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না তিনি ঠিক কি বলছেন। তখন তিনি আমাকে বলেন — আমরা সবাই আসলে সমকামী এবং আমাদের সবকিছু উপভোগের চেষ্টা করা উচিৎ।”

জুন মাসে পদত্যাগের আগে বিশপ দুয়ার্তে বিবিসিকে বলেন, তিনি শুনেছেন ফাদার ‘এইচের’ “সমকামীতার সমস্যা” সমস্যা রয়েছে, তবে সেসবে নাক গলানোর কর্তৃত্ব তার ছিলনা।

মরিসিও পালগার (সর্ব ডানে) বলেন, তাকে পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বলা হয়েছিল।

মরিসিও বলেন, “ফাদার এইচ তাকে তার গির্জায় এক রাতে থাকতে বলেন, তিনি আমাকে কিছু পানীয় দিয়েছিলেন এবং তা খেয়ে আমি অসুস্থ বোধ করতে থাকি, তিনি তখন বলেন, ‘আমার বিছানায় শুয়ে পড়ো’।”

“আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। পরে ঘনঘন শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দে আমি জেগে উঠে দেখি তিনি আমাকে নির্যাতন করছেন। আমি হাত-পা ছঁড়তে চেয়েও পারিনি। একসময় আমি একটি হাত ছাড়াতে পারি, কিন্তু তিনি তা ধরে ফেলেন এবং…”

কথা বলতে বলতে গলা বুজে আসে মরিসিওর।

“তিনি তখন টাকা ভর্তি একটি ড্রয়ার খোলেন এবং বলেন আমি এখন তার চক্রের অংশ। আমি তাকে বললাম আমি তা হতে চাইনা এবং এরপর আমি বেরিয়ে যাই।”

মরিসিও ঐ স্কুল ছেড়ে দিয়েছিলেন, তবে কেন ছেড়েছিলেন সে কথা বলতে তার ২০ বছর লেগে গিয়েছিল।

২০১৩ সালে তিনি গির্জা কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন।

বিশপ দুয়ার্তে বলেন, “অবশ্যই তদন্ত হয়েছিল, তবে অপরাধের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, সমকামিতা ‘পাপ’ কিন্তু দুজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক এতে যুক্ত হলে তা অপরাধ হয়না।

সেবাস্তিয়ান দেল রিও

১২ বছর বয়স থেকে সেবাস্তিয়ান রিও পাদ্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেনএবং ১৯৯৯ সালে হাই স্কুল শেষ করে তিনি একটি ধর্মীয় স্কুলে ঢুকে পড়েন।

গির্জার ঐ স্কুলের ডিন ছিলেন ফাদার ‘এম’ যিনি মরিসিওকে নগ্ন হয়ে সাঁতার কাটতে বাধ্য করেছিলেন।

সেবাস্তিয়ান বলেন ফাদার এম তার ব্যপারে অতিরিক্ত উৎসাহ দেখাতেন।

“ছোটোখাটো কথা বলতে তিনি আমার রুমে আসতেন, আমি ভয়ে দরজা খুলে রাখতাম।”

একসময় সেবাস্তিয়ান ঐ স্কুলের দায়িত্বে থাকা বিশপকে বিষয়টি জানান। তখন বিশপের জবাব ছিল, “ঐ পাদ্রীর কিছু ইমোশনাল সমস্যা হয়েছে।” “তিনি আমাকে বলেন ফাদার এম আমার প্রেমে পড়ে গেছেন।”

ফাদার এম কে পরে বদলি করা হয়, তবে সেবাস্তিয়ানের দুর্ভোগ তাতে শেষ হয়ে যায়নি।

পোপ ফ্রান্সিস চিলির সব বিশপকে ডেকে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

পড়াশোনা শেষ করার পর তার পাদ্রী হওয়া নিয়ে কথা বলতে তিনি বিশপ দুয়ার্তের কাছে যান।

“আমরা কথা বলছিলাম, হঠাৎ তিনি (বিশপ) অর্ধ-নগ্ন হয়ে তার পিঠে একটি মলম মালিশ করতে বলেন, আমি অপমানিত হয়েছিলাম।”

বিশপ দুয়ার্তে বলেন, তার কোনো খারাপ মতলব ছিলনা।

২০১০ সালে সেবাস্তিয়ান ফাদার এম এবং বিশপ দুয়ার্তের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনেন, তবে কোনো জবাব তিনি পাননি।

ফাদার এইচ এবং ফাদার এমের সাথে যোগাযোগ করে এসব অভিযোগের উত্তর চাওয়া হলেও, তারা বিবিসিকে কোনো জবাব দেননি। ফাদার এম এখনও একজন পাদ্রি হিসাবে কাজ করছেন।

Spread the love

Related posts