ব্রেকিং নিউজ

বগুড়ায় বিদেশী সবজির চাষাবাদ বাড়ছে

বগুড়ায় বিদেশি সবজি এর ছবির ফলাফল

বগুড়ায় বিদেশী সবজি উৎপাদনে এগিয়ে এসেছেন কয়েকজন কৃষি উদ্যোক্তা। আবাদ করছেন রেড ক্যাবেজ, বেবিকর্ন, সুইট কর্ন, ক্যাপসিকাম, ব্রকোলি, চেরি টমেটো, ফ্রেশ বিন, অ্যাসপারাগাস, রুট বিট, থাই আদা, লেটুস পাতা, থাই রসুন, লেটুস, ক্যারি লিফ মাসরুম ইত্যাদি সবজি। স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠছে এককালের অপরিচিত এসব সবজির বাজার। এসব পণ্য আবাদ করে নিজের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নও ঘটিয়েছেন অনেকে।

আদর্শ কৃষি জেলা হিসেবে অনেক আগে থেকেই পরিচিত বগুড়া। জেলাটিতে ধান, পাট, আলু, মরিচ, কলা, সবজিসহ বিভিন্ন পণ্য আবাদে পাওয়া গেছে সাফল্য। জেলাটিতে সরিষা, গম, ভুট্টা, বাদাম, আদা, রসুন, কচু, ইক্ষু ইত্যাদি ফসলের আবাদ হয়ে এসেছে নিয়মিত।

যমুনা, করতোয়া, কাঙ্গালীসহ অসংখ্য উপনদী, ছোট নদী-খাল-বিল বিধৌত জেলা বগুড়ার কৃষিভাণ্ডারকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলেছে বিভিন্ন জাতের বিদেশী সবজি।

জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কৃষকদের মধ্যে এ ধরনের সবজি আবাদের জনপ্রিয়তা বেশি। উৎপাদিত এসব সবজি জেলার স্থানীয় বাজারে তো যাচ্ছেই, একই সঙ্গে সরবরাহ হচ্ছে রাজশাহী, রংপুর, গাইবান্ধা, পাবনা, ঢাকা, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলার হোটেল-মোটেলেও।

শিবগঞ্জের ময়দানহাট্টা ইউনিয়নের বুজরুক শোকড়া গ্রামের কৃষক আলহাজ আনসার আলী প্রধানত অ্যাসপারাগাস চাষ করে আসছেন। এর সঙ্গে তিনি লেটুস পাতা, রেড ক্যাবেজ, সুইট কর্ন, ব্রকোলি, স্কোয়াস, চেরি টমেটো, বিট রুট, ক্যাপসিকামসহ বিভিন্ন দেশী-বিদেশী জাতের ২৪ ধরনের সবজি চাষ করছেন।

ঔষধি গুণসম্পন্ন ও উচ্চপুষ্টিমানের সবজি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ ইউরোপের দেশগুলোয় অ্যাসপারাগাসের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। দেশের বাজারেও পণ্যটি বিক্রি করে মুনাফা পাওয়া যায় ভালোই। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় গড়ে ওঠা থ্রি স্টার, ফোর স্টার ও ফাইভ স্টার হোটেলগুলোকে কেন্দ্র করেও এর নীরব একটি বাজার গড়ে উঠছে। পাওয়া যাচ্ছে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট স্টোর ও চেইন শপগুলোতেও। ভিন দেশী এ সবজি আবাদ করে কৃষি পদকও পেয়েছেন শিবগঞ্জের আনসার আলী।

সফল কৃষক আনসার আলী আগে ধান, পাট, আলুর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করতেন। ১৯৯৭ সালে সবজি বাজারজাত করতে গিয়ে টমেটোর এক বিদেশী জাতের খবর পান তিনি। উন্নত জাতের এ টমেটোর জীবত্কাল কম এবং ফলন ও ওজন অনেক বেশি। এর মধ্য দিয়েই তার বিদেশী সবজি আবাদে হাতেখড়ি। এরপর একপর্যায়ে বিদেশী মিষ্টি ক্যাপসিকাম চাষ শুরু করেন তিনি। প্রথম দিকে বিষয়টিকে হাস্যকর কিছু একটা বলে ধরে নিয়েছিল এলাকার মানুষ। প্রথমবারেই ভালো ফলন পাওয়া গেলেও সেখান থেকে তেমন কোনো লাভ পাননি। এলাকার মানুষ ক্যাপসিকাম জমি থেকে তুলে খেয়েছে। কেউ কেউ আবার চেয়েও নিয়েছে। পরের বছর বগুড়ার বাজারে বিক্রি করে লাভের মুখ দেখতে পান। এর পরের বছর সবজির পাইকারি ব্যবসায়ীরা আনসার আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করে সব ক্যাপসিকাম কিনে নিয়ে যান। এ সূত্র ধরে ঢাকার কয়েকজন পাইকারি ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার সখ্যতা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকার দু-তিনটি হোটেলে সরাসরি ক্যাপসিকাম বিক্রি শুরু করেন। ক্যাপসিকাম বিক্রি করতে গিয়ে প্রথম অ্যাসপারাগাস সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি। ২০০০ সালে ঢাকার এক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীর মাধ্যমে জাপানি অ্যাসপারাগাসের এক কেজি বীজ সংগ্রহ করেন আনসার আলী। ওই সময় এক কেজি বীজের দাম ছিল ১৪ হাজার টাকা। চাষের তিন মাসের মাথায় অ্যাসপারাগাস ফলন পেতে শুরু করেন তিনি। শুরুতে অ্যাসপারাগাস বিক্রিতে তেমন একটা সাড়া পাওয়া যায়নি। কোনো কোনো সময় বিক্রি না হওয়ায় শুকিয়ে যাওয়া অ্যাসপারাগাস ফেলেও দিতে হয়েছে। এর পরও ধৈর্য হারাননি তিনি। এভাবে চলার পর ২০০০ সালের দিকে সবজিটি বিক্রিতে সফলতা দেখা দেয়। দিন দিন অ্যাসপারাগাসের চাহিদা বাড়তে থাকে। ঢাকার সোনারগাঁও, শেরাটন (রূপসী বাংলা) ছাড়াও কয়েকটি থ্রি স্টার হোটেলে সবজিটি সরবরাহ শুরু করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে চেইন শপের বাজারও ধরে ফেলেন তিনি।

তিনি জানান, বর্তমানে শুধু ঢাকাতেই অ্যাসপারাগাসের দৈনিক চাহিদা ১০০ কেজিরও বেশি। কিন্তু বগুড়া থেকে আনসার আলী জোগান দিচ্ছেন গড়ে ২০ কেজির মতো। প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৪০০ টাকা করে। বর্তমানে তিনি মোট ৩৫ বিঘা জমিতে সবজি চাষ করছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগ জমিতে বিদেশী সবজি রয়েছে। অ্যাসপারাগাস, লেটুস পাতা, রেড ক্যাবেজ, সুইট কর্ন, ব্রকোলি, চেরি টমেটো, বিট রুট, ক্যাপসিকামসহ মোট ২৪ ধরনের সবজি আবাদ করছেন তিনি।

নিজের চেষ্টায় ওয়েস্টার্ন ভেজিটেবলস প্রডাকশন নামে কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন আনসার আলী। তিনি জানান, ২২ বছর ধরে সবজি চাষ করছেন তিনি। ১৪১৮ বঙ্গাব্দে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক, সিটি ব্যাংক পদকসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পদক পেয়েছেন তিনি। প্রশিক্ষণ পেলে আরো উন্নত মানের সবজি চাষ করতে পারবেন তিনি।

তিনি বলেন, এলাকায় অনেক সবজি উৎপাদন হয়। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে বাজারজাত করতে না পারায় প্রচুর সবজি নষ্ট হয়ে যায়। এসব সবজি কোল্ড স্টোরেজে রাখতে পারলে কৃষক যেমন দাম পেতেন, ঠিক তেমনি বাজারও নিয়ন্ত্রণে থাকত।

আনসার আলীর মতো বিদেশী সবজি চাষাবাদ করে নিজ ভাগ্যের বদল ঘটিয়েছেন বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার টেপাগাড়ীর আব্দুল মান্নানের ছেলে মিজানুর রহমান মিজান। নিজের ১৮ বিঘা জমিতে প্রায় ২০ ধরনের বিদেশী সবজি চাষ করছেন তিনি। চাষকৃত এসব বিদেশী সবজির বেশির ভাগই বিক্রি হয় ঢাকা ও বগুড়ায়। পাশাপাশি জয়পুরহাট, রংপুর, নওগাঁ ও রাজশাহীতেও এসব সবজি সরবরাহ করছেন তিনি। নিজ নামে গড়ে তুলেছেন মিজান অ্যাগ্রো প্রডাক্টস নামে এক বিদেশী সবজির খামার। তার জমিতে এখন রেড ক্যাবেজের চাষাবাদ হচ্ছে। চাষাবাদ হচ্ছে ক্যাপসিকামেরও। নিয়মিত এগুলোর যত্ন নিয়ে আসছেন তিনি। জমিতে সবজি ফলানোর পর বগুড়ার বিভিন্ন হোটেল, মোটেল ও ফোর স্টার হোটেলেও এসব সবজি সরবরাহ করে আসছেন তিনি।

এসএসসি পাস মিজান একসময় বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকায় চলে গিয়েছিলেন। সেখানে ফার্মগেট এলাকার খামারবাড়িতে অনুষ্ঠিত এক কৃষি প্রদর্শনীতে লেটুস, ব্রকোলি, রেড ক্যাবেজ ও চাইনিজ পাতার চাষ দেখেন। এখানকার কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এসব সবজি আবাদের ধারণা নেন তিনি। এরপর বাড়ি ফিরে যান। সেখানে কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ধীরে ধীরে এক বিঘা থেকে তার জমি এখন ১৮ বিঘায় পরিণত হয়েছে। এ জমিতে উত্পন্ন বিদেশী সবজিগুলো এখন ঢাকার বিভিন্ন সুপার শপে সরবরাহ করছেন তিনি। একই সঙ্গে বগুড়ার ১০-১২টি মোটেল ও ফোর স্টার হোটেলেও এসব সবজি সরবরাহ করছেন তিনি।

মিজানুর রহমান মিজান জানান, ১৮ বিঘা জমিতে তিনি চাইনিজ সবজি চাষ করেন। এ চাষাবাদে তার পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রায় ১০ জন শ্রমিক শ্রম দিচ্ছেন। বর্তমানে তিনি প্রতি কেজি অ্যাসপারাগাস সরবরাহ করছেন ৪০০ টাকায়। ব্রকোলি বিক্রি করছেন প্রতিটি ২৫ টাকায়। এছাড়া প্রতিটি সুইট কর্ন ১০ টাকা ও ক্যাপসিকাম ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন তিনি।

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসউদ আহমেদ জানান, বগুড়ায় চাষকৃত বিদেশী সবজি বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়ে থাকে। মূলত বড় হোটেলগুলোই এসব সবজির প্রধান ক্রেতা। শীতকালে এসব সবজির উৎপাদন বেশি হয়। স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে বিদেশী সবজি চাষীদের বিভিন্ন তথ্য, করণীয়, সবজি উৎপাদনের পর বিক্রির বিষয়ে সহযোগিতা ও কারিগরি সহায়তা, রোগবালাই দমনে করণীয় সম্পর্কেও বিভিন্ন পরামর্শ দেয়া হয়। উপজেলায় আরো কয়েকজন এখন বিদেশী সবজি আবাদের চেষ্টা করছেন। তারা সবে শুরু করেছেন। মিজানুর রহমান মিজান ও আনসার আলী বড় চাষী। বিদেশী সবজি চাষের মাধ্যমে তারা যেমন নিজের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থান শক্ত করেছেন, তেমনি স্থানীয় চাষীদেরও স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছেন।

বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ প্রতুল চন্দ্র জানান, বগুড়ায় বেশকিছু বিদেশী সবজি চাষ হচ্ছে। জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় দু-তিনটি ক্ষেত গড়ে উঠেছে। বিদেশী নানা জাতের সবজি উৎপাদনের পর এগুলো ঢাকা, বগুড়া ও সিলেটের বিভিন্ন তারকা হোটেলে বিক্রি হয়ে আসছে।

Spread the love

Related posts