এশিয়ায় পাইলট চাহিদা বাড়ছে

Image result for বিমান

বোয়িং এর হিসেবে ২০৩৭ সাল নাগাদ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ২ লাখ ৪০ হাজার পাইলট দরকার হবে

একটি বেসরকারি ফ্লাইং একাডেমি পাইলট হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন নানজিবা খান।

এ প্রশিক্ষণের সুযোগ পেতে তাকে আরও ৫০-৬০ জন প্রতিযোগীর সাথে নানা পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে।

এখন দু থেকে তিন বছর প্রশিক্ষণ শেষে তিনি যখন ১৫০-১৬০ ঘণ্টা ফ্লাই করতে পারলেই কেবল পেশাদার পাইলটের লাইসেন্স পাবেন সিভিল এভিয়েশন অথরিটি থেকে।

বিবিসিকে তিনি বলেন, “চারটি ধাপের পরীক্ষা দিয়ে আমরা ভর্তির সুযোগ পেয়েছি।”

আর এভাবে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রতিবছর মাত্র ৩০/৩৫ জন পাইলট তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে, জানালেন বেসরকারি গ্যালাক্সি ফ্লাইং একাডেমির প্রধান নির্বাহী নজরুল ইসলাম।

যদিও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল আলম বলছেন প্রশিক্ষণের সুবিধা বাংলাদেশে বাড়ছে ফলে তিনটি সক্রিয় একাডেমিতে প্রতি বছর প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহীর সংখ্যাও বাড়ছে।

কেমন পরীক্ষা হয় পাইলট প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য

স্কুল ও কলেজ জীবনে যারা বিজ্ঞানে পড়ালেখা করেছেন এ সুযোগ কেবল তাদের জন্য। আবার বিষয় হিসেবে পদার্থবিদ্যা ও গণিত অবশ্যই তাদের থাকতেই হবে।

উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর তারা প্রশিক্ষণ একাডেমিতে আবেদন করতে পারেন। এরপর লিখিত, মৌখিক, মেডিকেল সহ কয়েকটি ধাপে পরীক্ষা হওয়ার পর একজন পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে ভর্তি হতে পারেন।

তবে নানজিবা খান বলছেন, “এসব পরীক্ষা এরপরেও নিয়মিত দিতে হয় তাদের। এমনকি পাইলট হওয়ার পরেও। বাবার হিয়ারিংয়ের মতো কিছু বিষয় আছে যেগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় সবসময়।”

তবে পাইলট হতে হলে কয়েকটি ধাপ পেরোতে হয়।

প্রথমে গ্রাউন্ড কোর্সের পর সংশ্লিষ্ট একাডেমিতে লিখিত পরীক্ষা দিতে হয় এবং পরে উত্তীর্ণরা সরাসরি বিমান চালনার জন্য সিভিল এভিয়েশনে স্টুডেন্ট পাইলট লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন।

এরপর সিভিল এভিয়েশন অথরিটি পরীক্ষা নেয়। সিএএবির পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে, তখনই এসপিএল দেওয়া হয়।

এ লাইসেন্স দিয়ে ৪০ থেকে ৫০ ঘণ্টা বিমান চালনার সার্টিফিকেট অর্জন করে, এরপর পিপিএল বা প্রাইভেট পাইলট লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হয়। তিন মাসের থিওরি ক্লাসও করতে হয় এসময়।

এর মধ্যেই অর্জন করতে হয় কিছুটা অভিজ্ঞতাও। যেমন এক জেলা থেকে অন্য জেলা।

এরপর আবারও লিখিত এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। উত্তীর্ণ হলেই মেলে প্রাইভেট পাইলট লাইসেন্স।

কিন্তু পাইলট হিসেবে চাকরির জন্য প্রয়োজন সিপিএল বা কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স। এ লাইসেন্স পেতে ১৫০ থেকে ২০০ ঘণ্টা বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হয়।

এ ছাড়া উত্তীর্ণ হতে হয় লিখিত ও স্বাস্থ্য পরীক্ষায়। পাশাপাশি থাকতে হয় একটি ক্রস কান্ট্রি ফ্লাইট চালানোর অভিজ্ঞতা ও তিন মাসের থিওরি কোর্সের সার্টিফিকেট। এভাবেই পাইলট ট্রেনিং সম্পন্ন করে হওয়া যায় একজন পাইলট।

বাংলাদেশে এ মূহুর্তে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি, আরিরাং ফ্লাইং স্কুল ও গ্যালাক্সি ফ্লাইং একাডেমিতে অনেকেই প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

নানজিবা খান বলছেন, এটি এখনো সচ্ছলদের জন্যই। কারণ প্রশিক্ষণ পুরোপুরি শেষ করতে অনেক সময় ৫০-৬০ লাখ টাকার।

তিনি জানান, তিনি যেখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন সেখানে প্রতি ব্যাচে ৮/১০ জন এ সুযোগ পাচ্ছে যদিও প্রতিবছরই পাইলট হতে আগ্রহীদের সংখ্যা বাড়ছে।

বাংলাদেশ বিমানের পাইলট এসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান বলছেন, গড়ে ৩৫ -৪৫ লাখ টাকার প্রয়োজন হয় একাডেমি গুলো থেকে প্রশিক্ষণ নিতে।

যদিও তার মতে, বাংলাদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ এখনো তেমনিভাবে গড়ে উঠেনি, রয়েছে প্রশিক্ষণ এয়ারক্রাফটেরও অভাব।

তবে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলছেন, আগে বাংলাদেশ বিমানের ছোট এয়ারক্রাফট ছিলোনা বলে নতুন পাইলট তৈরি হতো কম।

“এখন সেই সংকট নেই পাশাপাশি অনেকগুলো ফ্লায়িং একাডেমি হওয়াতে একদিকে পাইলট তৈরি হচ্ছে আবার অন্যদিকে চাকুরীর বাজারও প্রসারিত হচ্ছে।”

এশিয়া অঞ্চলে বিমান পরিবহনের প্রবৃদ্ধি ঘটবে অনেক, সেই সঙ্গে বাড়বে পাইলট ও কেবিন ক্রুদের চাহিদা।

বোয়িং এর পূর্বাভাস: কতটা সুযোগ নিতে পারবে বাংলাদেশ?

উড়োজাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বোয়িং পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, আগামী দুই দশকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে হাজার হাজার পাইলট, টেকনিশিয়ান এবং কেবিন ক্রু দরকার হবে।

সেখানে এত বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটবে যে মানুষের বিমান ভ্রমণ অনেক বাড়বে।

বোয়িং এর হিসেবে, ২০৩৭ সাল নাগাদ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ২ লাখ ৪০ হাজার পাইলট এবং ৩ লাখ ১৭ হাজার কেবিন ক্রুর চাহিদা তৈরি হবে।

তবে ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান বলছেন, এ চাহিদার হিসেব তৈরি করা হয়েছে চীনকে মাথায় রেখে।

তিনি বলেন, “চীনে সত্যিই এমন চাহিদা তৈরি হবে। এখনো চীনে পশ্চিমা বহু পাইলট কাজ করছেন।”

“বাংলাদেশকে এর সুবিধা নিতে হলে প্রথমেই সেখানে বাংলাদেশীদের জন্য ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমাধান করতে হবে। এটি হলে বিপুল সংখ্যক পাইলট সেখানে কাজের সুযোগ পাবে ও চীনারা খরচ ও অন্যান্য কারণে পশ্চিমাদের বদলে এ অঞ্চলের পাইলটদের কাজের সুযোগ বেশি দেবে।”

রহমান বলেন, একই সাথে ফ্লাইং একাডেমি গুলো থেকে যারা বের হচ্ছে তাদের সনদের সরকারি স্বীকৃতিরও প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

“এয়ারপোর্ট ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স বা এটিপিএলকে মাস্টার্স সমমান দিলে এ খাতে বেকারত্বের সম্ভাবনা কমবে। কারণ যারা পাইলট হিসেবে কাজের সুযোগ পাবেনা তারা যোগ্যতা অনুযায়ী এভিয়েশনের অন্য কাজের সুযোগ পাবে।”

অন্যদিকে কাজী ওয়াহিদুল আলম বলছেন, বাংলাদেশে প্রশিক্ষিত পাইলটদের একটা বড় টার্গেট হতে পারে ভারত। কারণ দেশটিতে প্রচুর এয়ারলাইন্স ও সামনে আরও আসবে কিন্তু সেই তুলনায় তাদের পাইলট সংখ্যা অনেক কম।

তবে বেসরকারি গ্যালাক্সি ফ্লাইং একাডেমির প্রধান নির্বাহী নজরুল ইসলাম বলছেন, বোয়িং যে চাহিদার কথা বলছে সেখান থেকে বাংলাদেশের লাভবান হতে হলে সরকারকেই কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

“প্রথমত চীনের সাথে সরকারিভাবে আলোচনা করে সেখানে পাইলটদের কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং এটি করতে হলে এভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয় করে স্বীকৃত একাডেমিক ডিগ্রির ব্যবস্থা করতে হবে পাইলটদের।,” তিনি জানান

তিনি আরো বলেন, “এখন তারা এইচএসসি পাশ করে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিমান চালাচ্ছেন কিন্তু চীনে কাজ করতে হলে সেটিকে একাডেমিক ডিগ্রির আওতায় নিতে হবে।”

ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের প্রশিক্ষণের মান তুলনামুলক অনেক ভালো কিন্তু চীন বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি ছাড়া কাউকে কাজ করতে দেবেনা সে কারণে এভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয় করে একাডেমিগুলোকে সম্পৃক্ত করলে বাংলাদেশ দারুণ লাভবান হবে।

Spread the love

Related posts