ব্রেকিং নিউজ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে বিতর্কের কি কারন ?

Image result for ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

বাংলাদেশে ২০১৩ সালে আইসিটি আইনে ৫৭ ধারা যুক্ত হওয়ার পর গত কয়েকবছর ধরে এই আইনে নাগরিকদের গ্রেফতার ও হয়রানির অভিযোগ তুলে ধারাটি বাতিলের অভিযোগ করে আসছিলেন গণমাধ্যম ও মানবাধিকার-কর্মীরা।

সরকারও ধারাটি বাতিল করে সাইবার অপরাধ দমনে নতুন একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের কথা বলেছিল।

কিন্তু গত ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল পাসের পর দেখা যাচ্ছে সেখানে ৪টি ধারায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিতর্কিত ৫৭ ধারাটিকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

এমনকি নতুন এই আইনে জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার আরও বেশি খর্ব হবে বলেও আশংকা করছেন অনেকে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আইসিটি অ্যাক্ট থেকে ভিন্ন?

সংসদে পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আসলে কি বলা আছে? আর এটা নিয়ে এতো উদ্বেগই বা কেন?

বাংলাদেশে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন ‘এডিটরস কাউন্সিল’ এর সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ আনাম মনে করেন, এই আইনের ফলে গণমাধ্যম-কর্মীদের কাজের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাবে।বাংলাদেশে ২০১৩ সালে আইসিটি আইনে ৫৭ ধারা যুক্ত হওয়ার পর গত কয়েকবছর ধরে এই আইনে নাগরিকদের গ্রেফতার ও হয়রানির অভিযোগ তুলে ধারাটি বাতিলের অভিযোগ করে আসছিলেন গণমাধ্যম ও মানবাধিকার-কর্মীরা।

তিনি বলছিলেন, ”আইনের ৩২ ধারায় বলা আছে ডিজিটাল মাধ্যমে সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গ করা হলে ১৪ বছরের সাজা। এখন সরকারি গোপনীয়তা কী? যে কোন জিনিষ যেটা সরকার অফিসিয়ালি জনগণকে জানাচ্ছে না, সেটাই তো সিক্রেট থেকে যাচ্ছে। এই আইন অনুযায়ী সেটা তো জনগণের জানার অধিকার নেই। কারণ সরকার সেটা জানাচ্ছে না। কিন্তু সাংবাদিকদের তো সেটা জানাই ২৪ ঘণ্টার কাজ। এটা তো স্টেট সিক্রেট হওয়ার ফলে আমি তো আর এখানে সাংবাদিকতা করতে পারবো না।”

তার মতে, পরোয়ানা ছাড়াই আইনের ৪৩ ধারায় তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, তাতেও চাপের মুখে পড়বেন গণমাধ্যম-কর্মীরা।

”৪৩ ধারা অনুযায়ী, কোন পুলিশ অফিসার যদি আমার মিডিয়া অফিসে এসে তল্লাশি করেন এবং মনে করেন যে তদন্তের স্বার্থে আমার অফিসিয়াল সার্ভারে তার ঢোকা দরকার এবং তিনি যদি সার্ভার জব্দ করেন, তাহলে অপরাধের আলামত থাকুক আর না থাকুক সার্ভার জব্দ হওয়ায় আমার ঐদিনের প্রকাশনা তো বন্ধ রাখতে হবে।”

”এটা কয়েকদিনও বন্ধ থাকতে পারে। এমনকি সরকার কোন খবরের কাগজ বন্ধ করার আদেশ না দিয়েও কাগজটা বন্ধ করে দিতে পারেন শুধু সার্ভারটা যদি উনারা কব্জা করে নেন।” বলছিলেন মাহফুজ আনাম।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৫৩ ধারায় বলা আছে আইনের ১৪টি ধারা থাকবে অ-জামিনযোগ্য।

এক্ষেত্রে মানবাধিকার ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মত মানবাধিকার আন্দোলনের নেত্রী সুলতানা কামাল।

তিনি বলছিলেন, ”আইনে ১৪ টি ধারা অ-জামিনযোগ্য করা হয়েছে। এসব ধারায় কাউকে গ্রেফতার করলে তার আর জামিন হবে না। এবং তার অপরাধ প্রমাণ হতে হতে হয়তো বেশ কিছুদিন চলে যাবে। ততদিন তাকে গ্রেফতার থাকতে হবে। শুধু সন্দেহের উপরে যখন তখন যে বাহিনীর যেটা কাজ না তাকে দিয়ে এরকম কাজ করা যায় না।”

গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার কর্মীদের আরেকটা বড় উদ্বেগ আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ফলে যেটা বাতিল হয়ে গেছে।

কিন্তু বাতিল হওয়া ৫৭ ধারাটি কয়েকটি ভাগে ভাগ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে বলে জানাচ্ছেন তারা।

আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারা বাতিল হলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নতুন রূপে তা ফিরে আসছে বলে অভিযোগ গণমাধ্যমকর্মীদের।

নতুন আইনের ২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, কারো মানহানি কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর মতো বিষয়গুলোকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

যেগুলোর শাস্তি ক্ষেত্র বিশেষে তিন থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড।

কিন্তু সুলতানা কামাল মনে করেন, এই ধারাগুলোতে অপরাধগুলো সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না হওয়ায় এসবের অপব্যবহারের যথেষ্ট সুযোগ থেকেই যাচ্ছে।

তবে দেশে সাইবার অপরাধ দমনে যে সুস্পষ্ট আইন থাকা দরকার সে বিষয়ে অবশ্য ভিন্নমত নেই কারো।

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলছিলেন, ”সাইবার অপরাধীদের জন্য আইন থাকবে। এতে আমরা আপত্তি তুলতে পারি না। কিন্তু এ আইনে যখন গণমাধ্যমকেও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, তখন তো সাংবাদিকরা জেল-জরিমানার খড়গ নিয়ে কাজ করতে পারবেন না।”

আনাম বলছিলেন, আইনটি সংসদে তোলার আগে এ সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সঙ্গে সম্পাদকদের যে বৈঠক হয়েছিলো সেখানে তারা সাইবার অপরাধ ও গণমাধ্যমকে একাকার না করার জন্য কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেছিলেন।

কিন্তু সেগুলো আমলে নেয়া হয়নি।

এডিটরস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ও দি ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম

”কমিটিতে আমাদের মূল বক্তব্য ছিল যে, আপনারা এই ধারাতে একটা প্রভিশন আনেন যে এই আইন গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। যদি সেটা করতে না পারেন তাহলে এমনটা করেন যে গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে যখনি এ আইনের কোন প্রয়োগ আসবে সেটা যেন প্রেস কাউন্সিল হয়ে আসে। কিন্তু এগুলো মানা হয়নি

তবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ইমরান আহমদ দিচ্ছেন ভিন্ন যুক্তি।

‘উনারা অনেক প্রস্তাবই দিয়েছিলেন, আমরা সেগুলো বিবেচনা করে দেখেছি। ডিজিটাল মাধ্যমে যখন কোন একটা অপরাধ হয়, সেখানে তো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না নিলে সেটা দমন করা যাবে না। আমরা তো প্রেস কাউন্সিলের জন্য অপেক্ষা করতে পারি না। এখানে আসল কথা হচ্ছে সবাই যদি সতর্ক থাকেন, বেআইনি কিছু না করেন, তাহলে তো কারো বিরুদ্ধে কিছু হবে না।’

আহমদ বলছেন, এই আইনে অযথা কারো হয়রানি হওয়ার কোন সুযোগ নেই।

কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর যে অপব্যবহার হবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে?”

Spread the love

Related posts