ব্রেকিং নিউজ

ইউটিউবে বাড়ছে ফুড চ্যানেলের জনপ্রিয়তা

Image result for ইউটিউব

কচুর পাতায় ভাপা ইলিশ, বিয়ে বাড়ির খাসির রেজালা কিংবা গরম গরম গুড়ের রসগোল্লা – বাঙালীর এসব রসনা বিলাস বাস্তব জীবনে আজকাল কদাচিৎ দেখা গেলেও ভার্চুয়াল দুনিয়ায় এদের দেখা মেলে সহজেই — কম্পিউটারের মাউসে মাত্র কয়েকটি ক্লিক করে।

বাঙালী, মোগলাই, চাইনিজ – নানা দেশের, নানা স্বাদের রান্নার সম্ভার নিয়ে ইউটিউবের ফুড চ্যানেলগুলিতে এখন বাঙালী ভোজন রসিকদের যেন মেলা বসেছে।

এতে কেউ তুলে ধরছেন দেশি-বিদেশ খাবারের দুর্লভ সব রেসিপি, কেউ ফাঁস করে দিচ্ছেন ঐতিহ্যবাহী সব খাবারের গোপন রহস্য, কেউবা আপনাকে নিয়ে যাচ্ছেন তাদের পছন্দের কোন রেস্টুরেন্টে, চেখে দেখছেন নানা পদের খাবার, পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন নামী শেফ কিংবা লুকিয়ে থাকা কোন প্রতিভার সাথে।

মজাদার খাবারের এসব ফুড চ্যানেলগুলোর রয়েছে চটকদার সব নাম: বেঙ্গলী ফুড চ্যানেল, স্পাইস বাংলা, বং ইটস্‌, এবং আরও কত কি।

এই চ্যানেলগুলো থেকে প্রায় প্রতিদিন আপলোড করা হচ্ছে নানা দৈর্ঘ্যের ভিডিও – নানা রেসিপি, নানা টিপস, রান্নাঘরের নানা কলা কৌশল। আর তা চেখে দেখতে ইউটিউবের বাঙালী দর্শকরা ঝাঁপিয়ে পড়ছেন দলে দলে।

যেমন ধরুন, ‘কুকিং স্টুডিও বাই উম্মে’। ইউটিউবে অসম্ভব জনপ্রিয় চ্যানেলগুলোর একটি।

এর সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে আট লক্ষ। প্রতি সপ্তাহে তিন থেকে চারটি রান্নার ভিডিও আপলোড করা হয় এই চ্যানেলে।

দু’হাজার পনের সালে চালু হওয়া এই চ্যানেলের তোলা ভিডিওগুলি মোট ১৩ কোটি বার দেখা হয়েছে।

এতে ৩২টা প্লে-লিস্ট রয়েছে যাতে নানা ধরনের ভিডিও রয়েছে: আচার/সস/চাটনি থেকে শুরু করে বিরিয়ানি, পোলাও, কাবাব কিংবা রয়েছে নানা ধরনের ডেসার্ট।

ঢাকার রুমানা আজাদ ‘রুমানার রান্নাবান্না’ নামে যে ইউটিউব চ্যানেলটি পরিচালনা করেন তার গ্রাহকের সংখ্যা সাড়ে চার লাখেরও বেশি।

২০১২ সালে চ্যানেলটি খোলা হলেও তার এক বছর পর থেকেই পুরাদস্তুর ভিডিও চ্যানেল হিসেবে কাজ শুরু হয়।

সন্তান জন্ম নেয়ার সুবাদে তিনি স্কুলে শিক্ষকতা বাদ দিয়ে ঘরে বসে ছিলেন।

“এই কাজে প্রথম উৎসাহ আসে আমার হাজব্যান্ডের কাছ থেকে”, বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি, “আমি ঘরে বসে বসে বোর হতে পারি ভেবে সেই আমাকে বললো: তোমার রান্নার হাত তো খুব ভাল। এটা দিয়ে কেন শুরু কর না?”

চালু হওয়ার পর থেকে এপর্যন্ত রুমানা আজাদের চ্যানেলে নানা মাপের মোট ৪০১টি ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। আর সেগুলো গ্রাহকরা দেখেছেন প্রায় ছয় কোটি বার।

রুমানা তার চ্যানেলের গ্রাহকদের জন্য তৈরি করেছেন ২৪টা প্লে-লিস্ট। ভাজি ভর্তা থেকে শুরু করে মাছ মাংস, মিষ্টির অনেক ভিডিও রয়েছে এই চ্যানেলে।

রুমানা আজাদ জানাচ্ছেন, গভীর রাতে শহরের কোলাহল যখন থেমে যায়, তখন শুরু হয় তার চ্যানেলের ভিডিও শুটিং। “৬/৭ ঘণ্টা লেগে যায় শুটিং শেষ করতে,” বলছেন তিনি, “শুরু করি গভীর রাতে তার পর শেষ হতে হতে কখনও কখনও ফজরের আজান পড়ে যায়।”

ইউটিউবে আরেকটি নজর-কাড়া চ্যানেলের নাম ভিলফুড। ভিলেজ ফুড চ্যানেল নিজেকে দাবি করে ‘ইন্ডিয়াজ নাম্বার ওয়ান ফুড চ্যানেল’ হিসেবে।

এর মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় চার লাখ। এই চ্যানেলের ৩৬টি প্লে-লিস্টে আপলোড করা ভিডিওগুলি মোট ৮ কোটি ৮৬ লক্ষবার দেখা হয়েছে।

এই চ্যানেলের বৈশিষ্ট্য হলো পশ্চিমবঙ্গের এক তরুণ তার দিদিমা যেসব গ্রামীণ রান্না করেন সেই ডিশগুলো খুব সহজভাবে ভিডিওতে তুলে ধরেন।

এই ভিডিওগুলিতে উপস্থাপকের কথার ফুলঝুরি নেই। নেই কোন সাজানো স্টুডিও।

খুব সহজ ভঙ্গীতে গ্রামীণ পরিবেশে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে দিদিমার হাতের জাদু: লাউ পাতায় দেশি মাগুর মাছ ভাপা, পোড়া কতবেল মাসালা, বক ফুলের পাকোড়া, দেশি কাঁকড়ার ঝোল, মৌফুলের কারি, তেল কৈ, ডুমুর চিংড়ি ইত্যাদি ডিশ, যা আজকাল খুব একটা দেখা যায় না।

জনপ্রিয় ফুড ম্যাগাজিন হ্যাংলা হেঁশেল। এর ইউটিউব চ্যানেলটি চালু হয়েছে বছর তিনেক আগে।

এর সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা প্রায় ৩৩,০০০। এর ভিডিওগুলি দেখা হয়েছে মোট ৩৪,৮২,০০০ বার।

হ্যাংলা হেঁশেলের সম্পাদক অনিলাভ চ্যাটার্জি বলছেন, এটা প্রথম কোন বাংলা ইন্টারন্যাশনাল ফুড ম্যাগাজিন যা সেরা শেফদের সেরা রেসিপির পাশাপাশি প্রতিভাবান রাঁধুনিদের সাথে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।

“মা-মাসিরা সারাটা জীবন ধরে রান্না করেন। কিন্তু সেই রান্নার স্বীকৃতি কোথায়?” বলছেন তিনি, “আমরা চেষ্টা করছি রান্নার মধ্যে যে প্যাশন রয়েছে, সেই প্যাশনকে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে।”

হ্যাংলা হেঁশেলে মোট স্টাফের সংখ্যা ৬০। ম্যাগাজিনের মাল্টিমিডিয়া সেকশন থেকেই ভিডিওগুলো শুট করে ইউটিউবে আপলোড করা হয় বলে জানালেন মি. চ্যাটার্জি।

কুকিং শো’র পাশাপাশি ইউটিউবের বাঙালী দর্শকদের জন্য তৈরি হয়েছে অনেকগুলো চ্যানেল যেগুলিতে নিয়মিতভাবে রেস্টুরেন্ট, মার্কেট, এবং স্ট্রিট ফুড রিভিউ করা হচ্ছে।

এরকমই একজন হলেন আদনান ফারুক। ঢাকার ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা।

কিন্তু পাশাপাশি ‘ডাইন আউট উইথ আদনান’ নামে ফুড ট্যুরিজম চ্যানেল পরিচালনা করেন।

গত বছরের ডিসেম্বর থেকে নিয়মিতভাবে ভিডিও আপলোড করছেন। এই নয় মাসেই তার সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা এক লক্ষ অতিক্রম করেছে।

এই চ্যানেলে আপলোড করা ৬৫টি ভিডিও এপর্যন্ত প্রায় এক কোটি বার ভিউ হয়েছে।

বিবিসি বাংলার সাথে আলাপ করার সময় তিনি জানালেন, মধ্যবিত্ত বাঙালীর পকেটে টাকা হলে হয় সে রেস্টুরেন্টে খেতে যায়, নয়তো যায় ঘুরতে।

আর তিনি চান এদের সাথে নতুন নতুন জায়গা এবং নতুন নতুন খাবারের পরিচয় করিয়ে দিতে।

“আমি চেষ্টা করি আমার ভিডিওগুলো যেন একঘেয়ে হয়ে না ওঠে,” বলছিলেন তিনি, “আর সে জন্যেই আমি ঘুরে বেড়াই নানা জায়গায়। তুলে আনি নানা স্বাদের ফুড রিভিউ।”

সাধারণভাবে তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার একটি করে ভিডিও আপলোড করেন। কিন্তু কোন ট্যুরে গেলে সেখান থেকে তৈরি হয় অনেকগুলো ভিডিও। ট্যুরের শেষে তিনি সপ্তাহে দুটি করে রিভিউ আপলোড করেন।

“আমি ইউটিউবের সম্ভাবনাকে কোন নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে দেখতে চাই না। আমার সাবস্ক্রাইবারদের মধ্যে ৪০% বাংলাদেশের, ৪০% পশ্চিমবঙ্গের। আর বাদবাকি ২০% অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন।”

ব্যবসায়িক সম্ভাবনা কতটা?

সামাজিক মাধ্যম নিয়ে স্ট্যাট কিউন্টারের এক সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে যে আট কোটি ১৬ লক্ষ ইন্টারনেট ইউজার রয়েছে তার মাত্র ৬% ইউটিউব দেখেন।

অর্থাৎ প্রায় ৪৯ লক্ষ মানুষের সামনে এসব ফুড চ্যানেল নিয়মিতভাবে তাদের কন্টেন্ট নিয়ে হাজির হচ্ছে। আর ইউটিউবের ব্যবহার বাড়ছে প্রতি বছর ৮% হারে।

কিন্তু ইউটিউবের যে একটি ব্যবসায়িক দিক রয়েছে সেটিকে ঠিক কতখানি ব্যবহার করতে পারছেন এই ফুড ভিডিও ব্লগার অর্থাৎ ভ্লগাররা?

ইউটিউবে যদি আপনার চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ১০০০ অতিক্রম করে এবং দর্শকরা যদি ভিডিওগুলি ৪০০০ মিনিট দেখেন তাহলে আপনারা চ্যানেল থেকে আপনি অর্থ আয় করার কথা চিন্তা করতে পারেন।

এ নিয়ে বিবিসি বাংলা যে ক’জন ইউটিউবারের সাথে কথা বলছেন, তারা কেউই তাদের আয় সম্পর্কে কোন তথ্য দিতে রাজি হননি। তবে ইউটিউবার আদনান ফারুক শুধু জানিয়েছেন, শুধু ইউটিউবের ইনকাম দিয়ে ঢাকা শহরে বেঁচে থাকা বেশ কঠিন।

কিন্তু বাঙালী ফুড ভ্লগারদের মধ্যে অনেকেই বলছেন, ইউটিউবের অমিত সম্ভাবনার বিষয়টিকে ভারতের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান কিংবা মার্কেটিং কোম্পানিগুলো দেখতে পারলেও বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো এখনও ধরতে পারছে না।

ব্যাপারটা কতখানি ঠিক? জিজ্ঞেস করেছিলাম বাংলাদেশের ডিজিটাল মার্কেটিং কোম্পানি বুমের‍্যাং ডিজিটাল-এর সিইও আফফান মাহমুদ চৌধুরীকে।

তিনি বলছেন, বাংলাদেশে কন্টেন্ট মার্কেটিং-এর যাত্রা শুরু মাত্র কয়েক বছর আগে

প্রথম দিকে বড় বড় ব্যান্ডগুলো এর সম্ভাবনা সম্পর্কে খুব একটা সজাগ ছিল না।

“কিন্তু এখন প্রতি বছর শিফট দেখতে পাচ্ছি। বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো টেলিভিশনের মত ট্র্যাডিশনাল মিডিয়ামের পাশাপাশি এখন ডিজিটাল মার্কেটেও ইনভেস্ট করছে।”

তবে ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাবে বলে তিনি মনে করেন।

Spread the love

Related posts