ব্রেকিং নিউজ

‘পাকিস্তানকে বাংলাদেশ বানিয়ে দাও’

Image result for বাংলাদেশ পাকিস্তান পতাকা

এক টেলিভিশন টক শোতে বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেল অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছিলেন জাইঘাম খান

“পাকিস্তানের উন্নয়ন যদি ঘটতে চান, সুইডেনকে না দেখে বাংলাদেশের দিকে তাকান। পাকিস্তানকে বাংলাদেশের মতো বানান।”

ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কয়েকদিন পর এক টেলিভিশন টক শোতে তাকে এই পরামর্শ দিয়েছিলেন জাইঘাম খান। তার কথা বিতর্কের ঝড় তুললো।

জাইঘাম খানের এই টক শোর ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেল সোশ্যাল মিডিয়ায়। ১৯৭১ সালে রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে যে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে গেল, সেই দেশকেই কীনা অনুসরণ করার পরামর্শ দিচ্ছেন একজন পাকিস্তানি উন্নয়ন কর্মী এবং কলামিস্ট !

এরপর গত কয়েক সপ্তাহ জাইঘাম খানের কথা নিয়ে আরও অনেক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত তার বক্তৃতায় এই মন্তব্যের উল্লেখ করেছেন। ভারতীয় গণমাধ্যমেও তার এই কথার সূত্র ধরে মন্তব্য এবং খবর প্রকাশিত হয়েছে। সেসবের জের ধরে পুরো বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে মিস্টার খান গতকাল ‘দ্য বাংলাদেশ মডেল’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের ‘দ্য নেশন’ পত্রিকায়।

ঠিক কোন পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বাংলাদেশকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে অনুসরণের জন্য পাকিস্তানকে পরামর্শ দিয়েছিলেন? আর এরকম একটি মন্তব্যের পর তিনি কী ধরনেরর প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে?

টেলিফোনে এ নিয়ে তিনি একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বিবিসি বাংলাকে। সেখানে তিনি সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন, কেন বাংলাদেশই হওয়া উচিত পাকিস্তানের জন্য অনুকরণীয় মডেল।

জাইঘাম খান একজন সোশ্যাল এনথ্রোপলজিস্ট। কাজ করেন একজন উন্নয়ন পরামর্শক হিসেবে। একই সঙ্গে কলাম লেখেন কয়েকটি পত্রিকায়। বিভিন্ন টেলিভিশন টক শো-তে তিনি এক পরিচিত মুখ। এক সময় পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় পূর্ণকালীন সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন।

ইমরান খান যখন পাকিস্তানকে একটি দুর্নীতিমুক্ত কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জেতেন, তখন তার দল টিআইপি এক্ষেত্রে উদাহারণ হিসেবে বার বার উল্লেখ করছিল ইউরোপের দেশ সুইডেনের কথা।

ঠিক সেরকম এক পরিপ্রেক্ষিতে টেলিভিশন টক শো-তে জাইঘাম খান তার বহুল আলোচিত মন্তব্যটি করেন।

বাংলাদেশের উদাহারণটি তিনি কেন দিয়েছিলেন? জানতে চেয়েছিলাম তাঁর কাছে।

“দেখুন, যখন আমরা একটা পশ্চিমা দেশকে আদর্শ হিসেবে বেছে নেই, সেখানে একটা মারাত্মক সমস্যা আছে। পশ্চিমা দেশগুলির উন্নয়ন ঘটেছে বহু শতাব্দী ধরে, সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলোও গড়ে উঠেছে বহু শত বছর ধরে। তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নটা ঘটেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। আর এদের অর্থনীতি বলুন, সমাজ বলুন—আমাদের চেয়ে এতটাই আলাদা যে তাদের অভিজ্ঞতা আসলে আমাদের ক্ষেত্রে মোটেই প্রযোজ্য নয়। আর এর বিপরীতে, যেসব দেশ আমাদের মতো, তাদের কাছ থেকে কিন্তু আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য খুবই লাগসই এবং প্রাসঙ্গিক”, বললেন তিনি।

এর বিপরীতে বাংলাদেশের কথা উল্লেখ করে জাইঘাম খান বলেন, “বাংলাদেশ তো পাকিস্তানের মতোই একটা দেশ। ধর্মের প্রভাব এখানে খু্বই গভীর। বেশিরভাগ মানুষ মুসলিম। তাদের বেশিরভাগ আবার সুন্নী। আমাদের চিন্তাভাবনা, জীবনাচরণে এত মিল। তাহলে পাকিস্তান কেন এখানে আটকে আছে, আর বাংলাদেশ এতদূর এগিয়ে গেছে। এজন্যেই আমি মনে করি, আমাদের যদি শেখার কিছু থাকে, সেটা বাংলাদেশের কাছে। পশ্চিমা দেশের কাছে আমাদের শেখার কী আছে?”

একই ইতিহাসের অংশ

বাংলাদেশের জনসংখ্যা কর্মসূচীর সাফল্যের উদাহারণ দিয়ে তিনি বললেন, “বাংলাদেশ তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এক দশমিক এক শতাংশে নামিয়ে আনতে পেরেছে। যেটা একটা বিরাট সাফল্য। এর বিপরীতে পাকিস্তানে আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখনো দুই দশমিক চার। সেখানেই আমরা আটকে আছি।”

শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নয়- অর্থনীতি, মানবিক উন্নয়ন সূচক, সামাজিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন—ইত্যাদি সবক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে জাইঘাম খান বলছেন, বাংলাদেশই হওয়া উচিত পাকিস্তানের উন্নয়নের মডেল।

“আমার মতে পাকিস্তানের সামনে শেখার জন্য উদাহারণ হিসেবে যে কয়েকটি দেশ আছে, তার একটি বাংলাদেশ, আর আছে ইরান এবং ইন্দোনেশিয়া।”

জাইঘাম খানের মতে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের তুলনা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক এ কারণে যে এই দুই দেশ একই ইতিহাসের অংশ। দুই দেশের রয়েছে একই ঔপনিবেশিক অতীত। অথচ দুই দেশের উন্নয়নের গতিপথ একেবারেই ভিন্ন পথে চলেছে গত কয়েক দশকে।

দুদেশের সম্পর্কে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ক্ষত এখনো বড় কাঁটা হয়ে আছে।

“পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের সামনে কিন্তু চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি। বাংলাদেশের আয়তন অনেক কম। প্রাকৃতিক সম্পদ অনেক কম। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশ অনেক বেশি নাজুক অবস্থানে। কিন্তু এসব অতিক্রম করে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার তো মনে হয় বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের এক দারুণ মূহুর্তের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।”

১৯৭১ সালের যুদ্ধের ক্ষত

কিন্তু যে দেশ থেকে একটি রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ, যে যুদ্ধের ক্ষত এখনো পর্যন্ত পুরোপুরি শুকায়নি, সেখানে পাকিস্তানের সামনে বাংলাদেশের এই উদাহারণ দেয়ার পর কী ধরণের প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন তিনি?

“পাকিস্তানে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল বেশ ভালো। এধরণের কথা বার্তা হচ্ছিল, দেখ, দেখ, যে দেশটা একসময় আমাদের সঙ্গে ছিল, যাদের প্রতি আমরা এত অন্যায় করেছি, তারা এখন এতটাই ভালো করছে। এটা পাকিস্তানে ব্যাপক কৌতুহলের সৃষ্টি করে। লোকে এটা নিয়ে কথা বলেছে। নেতিবাচকভাবে নয়, বাংলাদেশের প্রশংসা করে। আমি পাকিস্তান থেকে কোন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাইনি।”

জাইঘাম খান মনে করেন, বেশিরভাগ পাকিস্তানি বাংলাদেশের এই সাফল্যকে ভালোভাবে দেখেন, বাংলাদেশের এই সাফল্যকে উদযাপন করেন। তার মতে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় বাংলাদেশে যা ঘটেছিল, তার ব্যাপারে বেশিরভাগ পাকিস্তানি ছিল অন্ধকারে। সামরিক বাহিনী তখন যে একটা বিরাট অন্যায়, অন্যায্য এবং নিষ্ঠুর কাজ করেছিল, তা এখন সাধারণ পাকিস্তানিরাও স্বীকার করে।

“১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যা ঘটেছিল, তা ছিল একটি সামরিক একনায়কতন্ত্রের কারণে। তখন বাংলাদেশ, বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটছিল, তা কিন্তু পাকিস্তানের মানুষ জানতে পারছিল না। তখন এমনভাবে সব ঘটনা ব্ল্যাকআউট করা হয়েছিল যে তারা জানতে পারছিল না। যা ঘটছিল, তাতে তাদের সায় ছিল না, তারা এটা সমর্থন করছিল না। এখন যদি আপনি কোন পাকিস্তানিকে রাস্তায় থামিয়ে জিজ্ঞেস করেন, তারা কিন্তু কম-বেশি সাধারণ বাংলাদেশিদের বর্ণনাকেই সমর্থন করবেন। তারা বলবেন, এটা ছিল, খুবই অন্যায়, অন্যায্য। খুবই নিষ্ঠুর।”

বাংলাদেশকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে উদাহারণ দিয়ে এর বিপরীতে তিনি অবশ্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন বাংলাদেশিদের দিক থেকে।

“বাংলাদেশ থেকেও আমি অনেক ভালো প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। তবে অনেক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও পেয়েছি। সেটা আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে বাংলাদেশে পাকিস্তানের প্রতি মনোভাব এখনো বেশি মিশ্র।”

জাইঘাম খান মনে করেন, ১৯৭১ সালের ঘটনাবলীর ব্যাপারে সাধারণ পাকিস্তানিদের এখনকার মনোভাব সম্পর্কে বাংলাদেশিরা ভালোভাবে অবগত নন।

“পাকিস্তানে বাংলাদেশের প্রতি একটা বিরাট শুভকামনা আছে। বাংলাদেশ একটা দারুণ সময় পার করছে। এটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও একটা বিরাট ব্যাপার। আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে বাংলাদেশের কাছে। আমরা এতে খুশি। কিন্তু পাকিস্তানের এই মনোভাবের কথা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে অজানা।”

Spread the love

Related posts