হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবন করেছে রাশিয়া

হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবন করেছে এর ছবির ফলাফল

রাশিয়া একেবারে নতুন ধরণের এক হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবন করেছে, যেটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সামরিক শক্তির ভারসাম্য পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাশিয়ার এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের নাম আভনগার্ড হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্র। এটি চলে শব্দের চেয়ে বিশগুণ বেশি গতিতে। রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন, এটি বিশ্বের যে কোন প্রান্তে গিয়ে হামলা করতে সক্ষম এবং একে ঠেকানোর মতো প্রযুক্তি এখনো পর্যন্ত কারও হাতে নেই।

সফল পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ

গত বুধবার রাশিয়া এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে পরীক্ষামূলকভাবে।

রাশিয়ার দক্ষিণ-পূর্বের উরাল পর্বতমালা থেকে এটি উৎক্ষেপণ করা হয়, এরপর এটি গিয়ে আঘাত করে ছয় হাজার কিলোমিটার দূরে দূরপ্রাচ্যের কানচাকায়।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন আভনগার্ড হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণকে তাঁর দেশের সশস্ত্র বাহিনী এবং তার দেশের জন্য এক বিরাট ঘটনা বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেছেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা পুরোপুরি সফল হয়েছে। এটির যে কারিগরি এবং কৌশলগত সব বৈশিষ্ট্য- তার সবই এই পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে।

মস্কোর ন্যাশনাল ডিফেন্স সেন্টার থেকে নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ দেখছেন প্রেসিডেন্ট পুতিন

রাশিয়ার ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ইউরি বরিসভ দাবি করেছেন, পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণে এই ক্ষেপণাস্ত্রটির গতি ছিল ঘন্টায় প্রায় ৩৩ হাজার ২০২ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার।

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্রের পার্থক্য কী

ব্রিটিশ আমেরিকান সিকিউরিটি ইনফরমেশন কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক পল ইংগ্রাম বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করেছেন, ব্যালিস্টিক মিসাইলের সঙ্গে হাইপারসোনিক মিসাইলের পার্থক্য।

এখন যে ধরণের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রচলিত, সেগুলো ছোঁড়া হয় রকেটের মতো। ফলে একবার উৎক্ষেপন করার পর এর ট্রাজেক্টরি বা সম্ভাব্য গতিপথ মোটামুটি অনুমান করা যায়। শত্রুপক্ষ তখন সে অনুযায়ী তাদের ক্ষেপনাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে এই ক্ষেপনাস্ত্র ধ্বংসের চেষ্টা করতে পারে।

কিন্তু হাইপারসোনিক মিসাইলের প্রযুক্তি একেবারেই ভিন্ন ধরণের। এটি উৎক্ষেপনের পর খুব দ্রুত উপরে উঠে যায়। তারপর আবার দ্রুত নেমে আসে। এরপর আনুভূমিকভাবে এটি বায়ুমন্ডলের মধ্যেই চলতে থাকে। চলমান অবস্থাতেও এর গতিপথ পরিবর্তন করা যায়। তার মানে হচ্ছে এটি কোন দিকে যাবে আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব নয়। ফলে এটি মাঝপথে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব।

কীভাবে এটি বদলে দিতে পারে শক্তির ভারসাম্য

রাশিয়াকে বিশ্বের এক নম্বর সামরিক শক্তিতে পরিণত করতে চান প্রেসিডেন্ট পুতিন

প্রেসিডেন্ট পুতিন এই সফল পরীক্ষার পর এতটাই উচ্ছ্বসিত যে, তিনি রুশ ব্যবসায়ীদের নাকি বলেছেন, এখন আর রাশিয়াকে হুমকি দেয়ার মতো কোন শক্তি বিশ্বে নেই।

আসলেই কি তাই? রুশ-মার্কিন অস্ত্র প্রতিযোগিতায় রাশিয়া কি অনেক বেশি এগিয়ে গেল?

ব্রিটিশ আমেরিকান সিকিউরিটি ইনফরমেশন কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক পল ইংগ্রাম বলছেন, রাশিয়ার দাবি যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এখন পুরোপুরি সেকেলে অস্ত্রে পরিণত হলো।

স্নায়ুযুদ্ধ আবার ফিরে আসছে বিশ্বে?

রাশিয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনও এই হাইপারসোনিক প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা করছিল। তারা এক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত মোতায়েনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ তারা করতে পারেনি।

পল ইংগ্রাম বলেন, রাশিয়ার হাতে এরকম ক্ষেপণাস্ত্র থাকার মানে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম, অর্থাৎ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে গেল। কারণ তারা এতদিন পর্যন্ত ব্যালিস্টিক মিসাইলের দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে। ব্যালিস্টিক মিসাইল ঠেকানোর জন্যই তাদের পুরো ডিফেন্স সিস্টেম গড়ে তুলেছে। তাদের সেই প্রযুক্তি দিয়ে রাশিয়ার এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো যাবে না। এর মানে হচ্ছে রাশিয়া এখন স্বস্তিতে থাকতে পারবে এই ভেবে যে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র থামানোর ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই।

কবে নাগাদ এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হবে

হাইপারসোনিক ক্ষেপনাস্ত্র থামানোর প্রযুক্তি এখনো কোন দেশের হাতে নেই।

আগামী বছর থেকে রাশিয়া এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা সফল হওয়ার পরপরই একথা জানিয়েছেন।

যেদিন এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানো হয়, সেদিন তিনি মস্কোর ন্যাশনাল ডিফেন্স সেন্টার পরিদর্শন করেন।

এর আগে এ বছরেরই মার্চে প্রেসিডেন্ট পুতিন তাদের এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কথা জানিয়েছিলেন।

তিনি যে রাশিয়াকে বিশ্বের এক নম্বর সামরিক শক্তিতে পরিণত করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছেন, তার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মার্চে দেয়া এক ঘোষণায়।

যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার মধ্যে স্নায়ু যুদ্ধের সময় যে চুক্তি হয়েছিল, তাতে ভূমি থেকে নিক্ষেপনযোগ্য মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখন এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে, রাশিয়াও নতুন করে মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।

Spread the love

Related posts