ব্রেকিং নিউজ

ভেনেজুয়েলায় মুনাফার গন্ধ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র, না খেয়ে আছে মানুষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:মাটির নিচে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত্তি হয়েছে, তেমনি করেই এই সম্পদই তার বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেল সম্পদের ওপর এখন জারি আছে পরাশক্তি রাশিয়ার আধিপত্য। পাল্টা অধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মাদুরো সরকারকে যেততেনভাবে উৎখাতে তৎপর যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসনের তরফ থেকে সে দেশে ত্রাণ পাঠানো হলেও অতীতের ধারাবাহিকতায় নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মাদুরো সরকারকে দুর্বল করতে চাইছে তারা। নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগও। সার্বিক মার্কিন চাপে ভেনেজুয়েলার বিপর্যন্ত অর্থনীতি আরও বিপর্যন্ত হয়ে পড়েছে। এরইমধ্যে দেশ ছেড়েছে লাখ লাখ মানুষ। যারা দেশে আছেন, ন্যূনতম প্রয়োজনীয় খাদ্য-ওষুধ জুটছে না তাদের। বিশ্লেষকরা একে দেখছেন, দুই হাতির লড়াই হিসেবে। যেখানে মানুষের অবস্থা ঘাসের মতোন।

২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আর অর্থনৈতিক বিপর্যস্ততা ভেনেজুয়েলার জনগণকে তাড়িত করেছে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে। বিক্ষোভের সুযোগে গত ২৩ জানুয়ারি নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন বিরোধী দলীয় নেতা জুয়ান গুইদো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম স্বীকৃতিদাতা। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন গত ২৪ জানুয়ারি মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেই বলেছেন, তেলের কারণে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে পরিবর্তিত হয় তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সম্পদের ‘কাঙ্ক্ষিত’ ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুফল বয়ে নিয়ে আসতে পারে।’

গত ২৪ জানুয়ারি স্টুয়ার্ট ভার্নের উপস্থাপনায় ফক্স বিজনেসের আরেকটি অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাদুরো উৎখাত প্রচেষ্টার নেপথ্য কারণ সম্পর্কেও স্পষ্ট করে বলেছেন জন বোল্টন। ওইদিন তিনি বলেছেন, মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ মাদুরো, ‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর পক্ষকে’ ভেনেজুয়েলায় ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। তাকে উৎখাত করা সম্ভব হলে তা মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ‘একটি অত্যন্ত বড় পদক্ষেপ হতে পারে।’

দুই বছর পেছনের এক ঘটনায় চোখ ফেরালে দেখা যায়, ‘মার্কিন স্বার্থবিরোধী সেই শত্রুপক্ষ হলো রাশিয়া। ২০১৬ সালে তেলের চরম দরপতনের কারণে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি যখন চরমভাবে বিপর্যস্ত তখন নিকোলাস মাদুরো পিডিভিএসের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান সিটগোর ৪৯ দশমিক ৯ শতাংশ বন্ধক রাখে রাশিয়ার কাছে। পিডিভিএস ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল উত্তোলন প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে সিটগো পিডিভিএসের অধীনস্ত মার্কিন মালিকানাধীন । ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে পরিশোধন করা সিটগোর শেয়ারের বদলে রাশিয়া ভেনেজুয়েলাকে দেয় ১৫০ কোটি ডলারের ঋণ। নামমাত্র এই ঋণের বদলে কার্যত ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর গুরুতর নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায় রাশিয়া।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, মার্কিন বিনিয়োগকারীরা রাশিয়ার কাছ থেকে ভেনেজুয়েলার বন্ধক রাখা সিটগোর শেয়ার কিনে নিতে চেয়েছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট একজন মার্কিন বিনিয়োগকারী রয়টার্সকে বলেছিলেন, যদি রাশিয়ার কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ওই শেয়ার কিনতে না পারে তাহলে ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তেল সরবরাহ কিংবা সে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে না।

তেলের পাশাপাশি সোনারও ভূমিকা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মাদুরো উৎখাত প্রচেষ্টার পেছনে। ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট মাদুরো আরও অর্থনৈতিক সহায়তা পাওয়ার আশায় রুশ প্রতিষ্ঠানকে ভেনেজুয়েলার খনি থেকে সোনা উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছিল। সেটাও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় গেছে মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্র তাই ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি যুক্তরাজ্যকে চাপ দিচ্ছে ভেনেজুয়েলার ১.২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সোনার মজুত আটকে রাখার জন্য। মাদুরোর সরকার এই সোনা ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে জমা রেখেছে। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার সোনা কেনার ক্ষেত্রে আবুধাবিভিত্তিক বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর প্রতি নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।

এদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে দিনকে দিন বিপর্যস্ত থেকে বিপর্যস্ততর হয়ে উঠছে ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের জীবন। ক্রমেই খাবার দুর্লভ আর দুর্মূল্য হয়ে ওঠায়ে মুদি দোকোনের তাকগুলো খালি পড়ে আছে। মানুষের দেশ ছাড়ার সংখ্যা রেকর্ড ছাড়াচ্ছে। চলতি বছর মূল্যস্ফিতির পরিমাণ এক কোটি শতাংশ ছাড়িয়েছে। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে ভেনেজুয়েলার সাধারণ নাগরিকেরা ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে মানুষ। সরকারের পক্ষ থেকেও তাই ভিন্নমতালম্বীদের ওপর প্রানঘাতী দমন-পীড়ন নিয়মিত ঘটনায় দাঁড়িয়েছে।

রাজধানী কারাকাসের রাস্তায় সরকার বিরোধী বিক্ষোভে প্রতিদিনই জড়ো হচ্ছে নতুন নতুন গ্রুপ। এক সময়ে যারা মাদুরো এবং তার পূর্বসুরি হুগো চ্যাভেজ এর সমর্থক ছিলেন তারাও এসব বিক্ষোভে যোগ দিচ্ছেন। এমনই একজন ব্যক্তি ৬৭ বছর বয়স্ক অরিস্তেলা দোনায়া। কারাকাসের বাসিন্দা দোনায়া এবং তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি সুবিধার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। তবে সেই সরকারি সুবিধা এখন যথেষ্ট নয়।নাতি-নাতনিদের মুখে খাবার তুলে দিতে তিনি এবং তার ছেলে দিক্সন ব্রন্ট কেমন সংগ্রাম করছেন তা বর্ণণা করতে গিয়ে দোনায়া বলেন, ‘আমরা না খেয়ে আছি। আমার ছেলের একটা নয় বছরের মেয়ে আর ১৭ বছরের একটা ছেলে আছে। তাদের জন্য কোনও খাবার কিনতে পারি না ।’

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলেজান্দ্রো ভেলাস্কো ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে রুশ আধিপত্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ভূ-রাজনীতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে সামনে এনেছেন একটি আফ্রিকান প্রবাদ। বলেছেন, ‘দুই হাতির মধ্যে যখন যুদ্ধ হয় তখন আসলে বিপদে পড়ে ঘাসগুলো।’

Spread the love

Related posts