লুম বাড়ছে, ফিরছে রেশমের ঐতিহ্য

নিউজ ডেস্ক:রেশমি বা সিল্কের পোশাকের চাহিদা দুনিয়াজুড়ে। এই পোশাক যেমন আরামদায়ক, তেমনি টেকেও বেশ। সেজন্য পোশাকের অভিজাত বিপণি ও ফ্যাশন হাউসগুলোতে বিভিন্ন ছাঁদ ও নকশায় তৈরি রকমারি রেশমি পোশাকের কাটতি বরাবরই ভালো। লাভ, আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের দিকটা ভেবে গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে রাজশাহী রেশম কারখানার ৬টি লুম চালু করা হয়। এবার আরও ৫টি লুম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর এর মাধ্যমে রেশমি কাপড়ের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা করছে রেমম বোর্ড।

রেশম গবেষক ও রেশম বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, অভিজাত বিপণি ও ফ্যাশন হাউসগুলোতে যেসব রেশমি পোশাক পাওয়া যায় তা রাজশাহী সিল্ক নামেই বেশি পরিচিত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেশম কাপড়ের মূল জোগানদার বৃহত্তর রাজশাহীর রেশম তাঁতিরা তথা রাজশাহী রেশম কারখানা।

রেশম গবেষক ও রেশম বোর্ডের কর্মকর্তারা আরও জানান, রাজশাহী রেশম কারখানা পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পর দুর্দিনে থাকা রেশম তাঁতিরা নতুন স্বপ্নে বুক বাঁধতে শুরু করেন; যারা  নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যুগ যুগ ধরে টিকিয়ে রেখেছেন এই শিল্প। আগের ৫টির সঙ্গে এবার নতুন করে কারখানায় আরও ৬টি লুম চালুর উদ্যোগ নেওয়ায় সুদিনের স্বপ্ন হাতছানি দিচ্ছে রেশম তাঁতিদের।

এ ব্যাপারে রাজশাহী রেশম কারখানা বলছে, পর্যায়ক্রমে কারখানার সব লুমই চালু করা হবে। এখন দীর্ঘদিন পড়ে থাকা ৬টি লুম ঘষে-মেজে চালুর উপযোগী করা হচ্ছে।

রাজশাহী মহানগরীর শিরোইল বাস টার্মিনাল এলাকায় ১৯৬১ সালে সাড়ে ১৫ বিঘা জমির ওপর স্থাপিত হয় এই রেশম কারখানা। রেশমের উন্নয়নে রাজশাহীতেই স্থাপন করা হয় বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড এবং বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের প্রধান কার্যালয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এক কোটি ১৩ লাখ টাকা ঋণের বোঝা মাথায় রেখে ২০০২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার কারখানাটি বন্ধ করে দেয়। এতে বেকার হয়ে পড়েন কারখানার প্রায় ৩০০ জন শ্রমিক। সে সময় অনেক আন্দোলন করেও কারখানাটি চালু করতে পারেনি রাজশাহীবাসী।

তারা আরও জানান, দীর্ঘদিন পর রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা রেশম বোর্ডের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর কারখানাটি চালুর উদ্যোগ নেন। তার প্রচেষ্টায় গেল বছরের ২৭ মে পরীক্ষামূলকভাবে কারখানার ৫টি লুম চালু করা হয়। পরে চালু হয় আরও একটি। এখন আরও ৫টি লুম চালুর প্রক্রিয়া চলছে। বন্ধ ঘোষণার সময় কারখানায় মোট ৬৩টি লুম ছিল। এর মধ্যে উৎপাদন চলতো পুরনো ৩৫টি লুমে। নতুন ২৮টি লুম চালুর আগেই কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বন্ধের আগে কারখানাটি বছরে একলাখ ৬ হাজার মিটার রেশম কাপড় উৎপাদন করতো। কারখানায় ৬৩টি লুম চালু করা গেলে বছরে কাপড় উৎপাদন হবে দুই লাখ ৮৭ হাজার মিটার। ধীরে ধীরে সব লুমই চালুর পরিকল্পনা আছে রেশম বোর্ডের।

বুধবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টায় রাজশাহী রেশম কারখানা ও বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট  পরিদর্শন করেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকার। পরে রেশম বোর্ড আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন তারা। সভায় সভাপতিত্ব করেন রেশম বোর্ডের মহাপরিচালক মুহাম্মদ আবদুল হাকিম। এতে রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মনসুর আলম, রেশম বোর্ডের সদস্য নাছিমা খাতুন,এমএ হান্নান, সচিব জায়েদুল ইসলাম, প্রধান সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম প্রমুখ ছিলেন।

সভায় জানানো হয়, রেশম কারখানায় এখন পরীক্ষামূলকভাবে ৬টি লুম চলছে। লুমগুলো এপর্যন্ত ২ হাজার ৬০০ গজ কাপড় উৎপাদন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বলাকা, স্পান সিল্ক থান, কোরা বলাকা, গরদ কাপড় ও থান কাপড়। আরও ৫টি লুম চালুর উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। আগামী মাসের মধ্যেই এ কাজ সম্পন্ন হবে। তখন উৎপাদন আরও বাড়বে।

রেশম বোর্ড কর্মকর্তারা জানান, এখন পর্যন্ত রেশম বোর্ডের নিজেদের উৎপাদিত গুটিতেই কারখানায় রেশম কাপড়ের উৎপাদন চলছে। তারা কারখানার সবগুলো লুমই চালু করতে চান। তবে এজন্য আরও বেশি পরিমাণ রেশম গুটি প্রয়োজন। তাই তাদের গুটির উৎপাদন বাড়াতেও কাজ করতে হচ্ছে। যত বেশি কাঁচামাল উৎপাদন বাড়বে, ততই বেশি সংখ্যক লুম চালু করা হবে।

এ ব্যাপারে সার্বিক সহায়তার আশ্বাস দিয়ে সভায় সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন,‘রেশম কারখানা ভালোমতো চালু এবং এ শিল্পে উন্নয়নের জন্য যা যা করা দরকার, শিগগিরই সেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে। রেশম শিল্পের রাজশাহীর ঐতিহ্য ভালোমতো ফিরিয়ে আনা হবে।

Spread the love

Related posts