বিবিধ

কিশোর গ্যাং কালচার বিস্তারের জন্য দায়ী অভিভাবকদের অসচেতনতা

নিউজ ডেস্ক : কিশোর গ্যাং কালচার তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে খেলার মাঠের সংখ্যা কমে যাওয়া, খেলার মাঠ দখল হয়ে যাওয়া এবং অভিভাবকদের সন্তানকে খেলার মাঠে পাঠানোয় অনীহা।

আরও অনেক কারণ নিশ্চয়ই আছে। সে জন্যই আমি বলেছি, অন্যতম কারণ। নিরাপত্তার নামে বাচ্চাদের আমরা ঘরে আটকে রেখে মূলত ওদের জীবনকেই অনিরাপদ করে ফেলছি।

পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে ওদের হাতে ফোন আর ট্যাব তুলে দেয়ায়। বাচ্চারা সারা দিন ধরে সেটিতে ভিডিও গেম খেলে, যার অধিকাংশই হচ্ছে মারামারি আর খুনোখুনি। ভার্চুয়াল লাইফে এটা করতে করতে কারও মনে রিয়েল লাইফেও এটা করার সাধ জাগাটা খুব অস্বাভাবিক কিছু না।

শিশুদের খেলার মাঠে না নিয়ে যাওয়া কিংবা ওদের হাতে ভিডিও গেম তুলে দেয়া ইত্যাদির দায়-দায়িত্ব অভিভাবক হিসেবে আমরা কি এড়িয়ে যেতে পারি? না, পারি না। শিশু-কিশোরদের আমরা সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে দিচ্ছি না। ছোটবেলায় দেখতাম- অভিভাবক তার সন্তানকে নিয়ে শিক্ষকের কাছে গিয়ে বলেন, ‘আমার সন্তানকে মানুষ করে দিন।’ আর এখন অভিভাবক সন্তানকে শিক্ষকের কাছে নিয়ে বলেন, ‘আমার সন্তানকে এ-প্লাস পাইয়ে দিন।’

যে বয়সে শিশুটির শুধুই ঘাসে, মাঠে গড়াগড়ি খাওয়ার কথা, সেই বয়সে তার ওপর আমরা চাপাই ‘এ-প্লাসের’ ভয়ানক মানসিক চাপ এবং যন্ত্রণা। আর বিনোদনের নামে তার হাতে ধরিয়ে দেই ভিডিও গেম। গত দুই দশকে বাংলাদেশে যেসব শিশু বড় হয়েছে, তাদের আসলে শৈশব বলতে কিছু নেই।

তাদের শৈশব শুধু ‘এ-প্লাস’-এর পেছনে দৌড়ানো, খেলার মাঠে দৌড়ানো নয়। এ-প্লাস পেলে ভালো সন্তান, না পেলেই সে খারাপ সন্তান। এই ভয়ংকর মানসিক চাপের একটা ভয়ংকর ফলাফল হওয়ার কথা।

খাবারে বিষ মিশিয়ে একদল নরপিশাচ খাদ্য ব্যবসায়ী যেভাবে শিশুদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সেই একইভাবে কোচিং সেন্টারগুলো শিশুদের বাবা-মায়ের সামনে ‘এ-প্লাস’-এর মুলা ঝুলিয়ে বাবা-মার সম্মতিতে শিশুদের শৈশবের বারোটা বাজাচ্ছে; তাদের মানসিক বিকাশ ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমি জানি, অনেক ব্যতিক্রমী বাবা-মাও আছেন; কিন্তু ব্যতিক্রম কখনও উদাহরণ হতে পারে না।

আমি-আপনি সবাই জানি, বড় অংশের বাবা-মা, অভিভাবকদের মানসিকতাটাই এখন এরকম এবং তাদের এই মানসিকতা তৈরিতে সহায়তা করেছে কোচিং সেন্টার নামক একটি অবৈধ ব্যবসা।

অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ পুরোপুরি হয় না, যদি না তারা ঘাসে-মাঠে-মাটিতে ছোটাছুটি করে, খেলাধুলা করে। উন্নত বিশ্বের সব দেশেই শিশুরা হচ্ছে ‘ফার্স্ট প্রায়োরিটি’। শিশুদের প্রতি রাষ্ট্রের নজর ও যত্ন চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। প্রতিটি শহর পার্কে আর খেলার মাঠে ভর্তি। প্রতিটি স্কুল নিশ্চিত করে, যেন তাদের ছাত্রছাত্রীরা খেলার মাঠে যায়। প্রতিদিন শিক্ষক তাদের সঙ্গে করে নিয়ে খেলার মাঠে যায়। রিদাকে যখন আমরা চার বছর বয়সে এখানে প্রি-কেজিতে ভর্তি করলাম, ২-৩ মাস পরেই মাইনাস ১৫-২০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় টিচাররা রিদা এবং তার সাথীদের নিয়ে খেলার মাঠে ছেড়ে দিত এবং সেটি প্রতিদিনকার স্কুলিংয়ের অপরিহার্য অংশ। এখানে আক্ষরিক অর্থেই শিশুরা খেলতে খেলতে শেখে, ঠিকঠাক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের মধ্য দিয়ে বড় হয়।

Back to top button
Close
Close