জাতীয়

সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে নিজের মায়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে আলোচিত ৪৯ মামলার আসামী কাঞ্চন

নিজস্ব প্রতিবেদক: আলোচিত ৪৯ মামলার আসামী একরামুল আহসান কাঞ্চনকে নিয়ে মুখ খুলেছেন তারই গর্ভধারীনি মা ৮৪ বছরের বৃদ্ধা কমরের নেহার। কাঞ্চন সম্পর্কে বলেছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। জানিয়েছেন, কাঞ্চন তার আপন মায়ের বিরুদ্ধেই ২টি মামলা করে, এমনকি নিজের মায়ের নামীয় সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে অন্য নারীকে মা বানিয়ে জাল দলিল তৈরী করে। আজ জাতীয় প্রেসক্লাবের আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে আলোচিত ৪৯ মামলার আসামী একরামুল আহসান কাঞ্চনের মা কমরের নেহার এসব কথা বলেন। এ সময় তার সাথে স্ব-পরিবারে উপস্থিত ছিলেন কাঞ্চনের বড় ভাই আক্তারী কামাল ও একমাত্র বোন ফাতেমা আক্তার, মামাতো ভাই শাকেরুল কবির ও তার দুই বোন। এছাড়া অনলাইনে স্ব-পরিবারে সংযুক্ত হন কাঞ্চনের ছোট ভাই কামরুল আহসান বাদল ও তার পরিবার।

কাঞ্চনের মা কমরের নেহার বলেন, রাজারবাগ দরবার শরীফের পীর সাহেব ক্বিবলা উনার নামে আমি কোন সম্পত্তি লিখে দেইনি। আমার স্বামীর অনুকরণে একটি মাদরাসা করার নিয়ত করায় আমার মেঝপুত্র কাঞ্চনের সাথে আমার ২০০৯ সাল থেকে থেকে বিরোধ হয়। তার কথা মেনে না নেয়ায়, সে ২০০৯ সালে অন্য মহিলাকে মা বানিয়ে আমার নামে জমির জাল দলিল তৈরী করে। ছেলে হয়েও সে আমার বিরুদ্ধে ২টি মামলা করে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে কাঞ্চনের মা কমরের নেহার বলেন, আমার স্বামী ডা আনোয়ার উল্লাহ সাহেব। ১৯৮৬ সালে তিনি ঢাকা রাজারবাগ দরবার শরীফে বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন। উনার অনুকরণে আমিও রাজারবাগ দরবার শরীফে বাইয়াত গ্রহণ করি। আমার স্বামী জীবিত থাকাকালে আমার বড় ছেলে ও একমাত্র কন্যাও ঢাকা রাজারবাগ দরবার শরীফের বায়াত গ্রহণ করে। আমার ২য় ছেলে একরামুল আহসান কাঞ্চনও ১৯৯৫ সালে জাপান থেকে ফিরে এসে রাজারবাগ দরবার শরীফে বাইয়াত হয় এবং তার দ্বিতীয় বিয়ের অনুষ্ঠানও রাজারবাগ দরবার শরীফে অনুষ্ঠিত হয়।

কমরের নেহার বলেন, আমার স্বামী আর্থিকভাবে সামর্থবান ছিলেন। তিনি অনেক জমিজমা ক্রয় করেন। ঢাকার শেওড়াপাড়ার জমি, শাহজাহানপুর থানার শান্তিবাগে বাড়ি, নারায়নগঞ্জের ফতুল্লার কুতুবাইলে ফ্যাক্টরি, তক্কার মাঠে জমি, পিলকুনিতে ৪টি প্লট উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি নোয়াখালীতে পৈত্রিক সূত্রে অনেক জমিজমা লাভ করেন। উনার ইন্তেকালের পর এই সম্পত্তিগুলোর কাঞ্চনসহ সবার মধ্যে বণ্টন হয়, যা প্রত্যেকের স্বচ্ছল জীবন-যাপনের জন্য যথেষ্ট।

কমরের নেহার বলেন, আমার স্বামী আমার জন্য আলাদা কিছু সম্পত্তি ক্রয় করেছিলেন। আমার সেই জমি থেকে কিছু জমি মাদ্রাসা ও ইয়াতিমখানায় দান করার নিয়ত করি। কিন্তু আমার এ দানের বিষয়টি অন্য সন্তানরা মেনে নিলেও দ্বিতীয় পূত্র একরামুল আহসান কাঞ্চন মানতে পারেনি। সে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে যেন, আমি আমার ভাগের সম্পত্তিটুকু পুরোটাই তাকে লিখে দেই, কোনভাবেই যেন মাদ্রাসায় জমি দান না করি। কাঞ্চন পৈর্তৃকসূত্রে পর্যাপ্ত সম্পত্তি লাভ করার পরও আমার দানের সম্পত্তির উপর লোভ সামলাতে পারে না। সে অন্য এক মহিলাকে মা বানিয়ে আমার জমির জাল দলিল তৈরী করে (জাল হেবা দলীল নং ১৩৯২৬, তারিখ: ২২/১১/২০০৯)।

কমরের নেহার বলেন, আমার স্বামীর সম্পত্তির সব দলিলপত্র সব সময় আমার মেঝ ছেলে কাঞ্চনের কাছেই জমা থাকতো। তাকে আমরা পরিবারের সবাই খুব বিশ্বাস করতাম। কিন্তু অন্য নারীকে মা বানিয়ে জাল দলিল তৈরীর পর সবাই নড়েচড়ে বসে এবং তখন কেঁচো খুড়তে সাপ বেড়িয়ে আসে। দেখা যায় প্রায় ১ যুগ আগেই সে আমাকে মৃত দেখিয়ে এবং তার একমাত্র বোন ফাতেমা আক্তারকে বাদ দিয়ে ওয়ারিশনামা তৈরী করেছে। কাঞ্চনের বানানো জাল দলিল বাতিল করতে এবং আমার কন্যার ওয়ারিশসত্ত্ব ফিরিয়ে আনতে আমি আদালতের দারস্থ হই। এতে কাঞ্চন ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করা শুরু করে। আমি গর্ভধারিনী মা হওয়া সত্ত্বেও আমার বিরুদ্ধে ২টি, তার আপন বড় ভাই আক্তারী কামালের বিরুদ্ধে ৭টি, তার একমাত্র বোনের বিরুদ্ধে ৩টি এবং তার মামাতো ভাই শাকেরুল কবিরের বিরুদ্ধে ৪টি মামলা করে।

কাঞ্চনের মা বলেন, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ যেন তার জ্বালায় অতিষ্ট হয়ে আমার দানের জমি গ্রহণ না করে সেজন্য রাজারবাগ দরবার শরীফ ও মুহম্মদীয়া জামিয়া শরীফ মাদ্রাসার সংশ্লিষ্ট লোকজনের উপর মামলা-হামলা করতে থাকে। অনেককে সে রক্তাক্ত করে হাসপাতালে পাঠায়। মাদ্রাসায় যাওয়া বোরকা পরিহিতা নারীদের সে উত্ত্যক্ত করতো। কিছুদিনের মধ্যে আমার পুত্র কাঞ্চনের আচরণ এতটাই উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠে যে, লজ্জায় আমার মুখ দেখানোর যায়গা থাকে না। তার কারণে আমার মান-সম্মান সব ধুলায় মিশে যায়।

কমরের নেহার বলেন, ২০১৪ সালে আমি সাব-রেজিস্টারের সামনে স্বেচ্ছায়, স্বজ্ঞানে স্বাক্ষর করে মুহম্মদীয়া জামিয়া শরীফ মাদ্রাসায় সর্বমোট প্রায় ৭৬ শতাংশ জমি দান করি। আমার বড়পুত্র আক্তারী কামাল ও কন্যা মোসাম্মত ফাতেমা আক্তার পরিবার নিয়ে ব্যস্ত সময় থাকে। এমতাবস্থায় আমি আমার ছোট ভাইয়ের ছেলে শাকেরুল কবিরের সাহায্য চাই। শাকের আমার বিপদের সময় এগিয়ে আসায় আমার অনেক উপকার হয়। শাকেরের কারণে জমি-জমাগুলো কাঞ্চনের দখলে যায় না, আমার নিয়ন্ত্রণেই থাকে। এতে কাঞ্চন শাকেরের উপর মারাত্মক ক্ষেপে যায় এবং মিডিয়ায় তার নামে আবোল তাবোল বলতে থাকে, যার কোনটাই সত্য না।

কাঞ্চনের মা কমরের নেহার বলেন, মাদ্রাসায় জমি দান করা হয়ে গেলে কাঞ্চন তা বাতিল করতে উঠে পড়ে লাগে। এজন্য সে মিডিয়ায় আমার সম্পর্কে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য প্রচার শুরু করে। প্রথম অবস্থায় সে বলে বেড়ায়, “আমাকে নাকি গুম করে আমার থেকে সম্পদ লিখে নেয়া হয়েছে। তাই আমার দান বিশুদ্ধ হয়নি।” তখন আমি বলি, “আমার থেকে কেউ জোর করে জমি লিখে নেয় নাই, বরং আমি স্বেচ্ছায় মাদ্রাসায় জমি দান করেছি।” আমার বক্তব্যের পর তার এ ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়।
কাঞ্চনের মা কমরের নেহার বলেন, এরপর কাঞ্চন মিডিয়ায় ‘আমি পাগল হয়ে গেছি, কাজেই আমার দান শুদ্ধ নয়’ বলে প্রচার শুরু করে। এজন্য সে প্রচার করে, আমি নাকি আমাদের থাকার শান্তিবাগের বাড়ি পীর সাহেবকে লিখে দিয়েছি। কিংবা পীর সাহেবের বড় মেয়ের বিয়েতে ৪০ ভরি ওজনের স্বর্ণের মুকুট দিয়েছি। প্রচার করে, সম্পত্তি বিক্রি করে নাকি আমি পীর সাহেবকে ১৩ কোটি টাকা দিয়েছি। আরো দাবী করে, সে নাকি জাপান থেকে একটা গাড়ি পাঠিয়েছে, সেই গাড়ি নাকি আমি পীর সাহেবকে দিয়ে দিয়েছি।

কাঞ্চনের মা কমরের নেহার আরো বলেন, প্রকৃত সত্য হলো, আমি মোটেও পাগল হয়নি, আমি সম্পুর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কে আছি। তাছাড়া আমি পীর সাহেবের বড় মেয়ের বিয়েতে ৪০ ভরি ওজনের কোন স্বর্ণের মুকুট তো দূরের কথা, কোন মেয়ের বিয়েতেই কোন গিফট দেইনি। আর আমি নিজেই যেখানে ১০ ভরি স্বর্ণও ব্যবহার করিনা, সেখানে অন্যকে কিভাবে ৪০ ভরি স্বর্ণ উপহার দিতে যাবো? অন্যদিকে শান্তিবাগের থাকার বাড়ি দেয়ার প্রশ্নই আসে না, কারণ শান্তিবাগের বাড়ি তো আমার স্বামীর নামে। আমি কিভাবেই সেই সম্পত্তি দিবো? এছাড়া ‘আমি সম্পত্তি বিক্রি করে ১৩ কোটি টাকা দিয়েছি’ এটাও সম্পূর্ণ বানোয়াট বক্তব্য। কারণ আমি আমার কিছু জমি বিক্রি করেছিলাম এটা ঠিক, কিন্তু বিক্রি করা জমির মূল্য ১ কোটি টাকার টাকারও কম। ১৩ কোটি টাকা দিবো কিভাবে? আর জাপান থেকে সে কখন কোন গাড়ি পাঠায়নি, এটাও সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা।

কমরের নেহার বলেন, সম্প্রতি কাঞ্চন নতুন করে প্রচার শুরু করছে, পীর সাহেব নাকি আমাকে বাইয়াত করে ভুলভাল বুঝিয়ে আমার সব সম্পত্তি লিখে নিচ্ছেন। আমি নাকি তাদের পৈর্তৃক সম্পত্তি থেকে তাদের বঞ্চিত করে পীর সাহেবকে সব সম্পত্তি লিখে দিচ্ছি। এটা সম্পূর্ণ ভুল কথা। আমি দরবার শরীফে নতুন বাইয়াত হয়নি। আমি ২৮ বছর ধরে দরবার শরীফের বাইয়াত। আমাকে নতুন করে বাইয়াত করে ভুল বুঝানোর কিছু নেই। পাশাপাশি আমি কোন সম্পত্তি পীর সাহেবকে লিখেও দেই নি। যতটুকু সম্পত্তি আমি দান করেছি সেটা একটা মাদ্রাসা ও ইয়াতিমখানার জন্য। পীর সাহেব বা দরবার শরীফের নামে নয়।

কাঞ্চনের মা কমরের নেহার মিডিয়া ও প্রশাসনের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা দয়া করে তার এই অসৎকর্মে সহায়তা করবেন না। কাঞ্চন যদি আমার দান করা জমি কেড়ে নিতে পারে, তবে সেখানেই সে থেমে থাকবে না। একটা সময় তার আপন ভাইবোনদের সম্পত্তির দিকেও হাত বাড়াবে। ইতিমধ্যে ওয়ারিশনামায় সে তার একমাত্র বোনকে বঞ্চিত করেছে, জাল হেবায় বড় ভাইকে বঞ্চিত করেছে আর শেওড়াপাড়া ও নারায়নগঞ্জের ফ্যাক্টরির জমিতে ছোট ভাইকে বঞ্চিত করেছে। সুযোগ পেলে ভাই-বোনদের পুরো সম্পত্তি সে গ্রাস করবে। আমি চাই, প্রত্যেকেই যেন তার প্রাপ্য জমির হক্ব বুঝে পায়, একজন যেন অন্যজনের হক্ব নষ্ট না করতে পারে।

কমরের নেহার তার ছেলে-মেয়ে নাতী-নাতনীদের ওসিয়ত করে বলেন, আমার মৃত্যুর পরও যেন আমার দান যেন অক্ষত থাকে, তা মাদ্রাসা ও ইয়াতিমখানা কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়। আমার আশঙ্কা হয়, আমি মারা গেলে কাঞ্চন আমার পরকালের সম্বল মাদ্রাসা-ইয়াতিমখানা হতে দিবে না, ঠিক যেভাবে তার পিতার ওসিয়ত করা হেফজখানা সে বন্ধ করে দিয়েছে। মিডিয়া ও প্রশাসনের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমার এ ওসিয়ত বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহায়তা করবেন, এটাই আপনাদের আমার প্রতি আকুল আকুতি।

Back to top button