জাতীয়

পদ্মা সেতু রেলপথ: কর্মসংস্থান হবে শতশত মানুষের

মাদারীপুর সংবাদদাতা: পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এই প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে ৭৩ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। সব ঠিক থাকলে আগামী জুন মাসে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সেতু দিয়ে চলতে শুরু করবে ট্রেন।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে পদ্মাসেতুর শরীয়পুরের জাজিরা প্রান্তের টোলপ্লাজা পর্যন্ত রেলপথ ইতোমধ্যে নির্মাণ শেষ হয়েছে। ট্রেনে চড়ে রাজধানী ঢাকা যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন মাদারীপুরের মানুষরা। আর এতে করে নতুন জীবিকা সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসবে দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে বলে মনে করছেন তারা।

পদ্মা সেতু রেল প্রকল্প সংশ্লিষ্ঠদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার এবং ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৯ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। কাজের অগ্রগতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে নতুন চার জেলা (মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও নড়াইল) অতিক্রম করে যশোরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ট্রেন চলবে চলতি বছরের জুন মাসেই।

সরেজমিন দেখা গেছে, ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে পদ্মা সেতুর জাজিরা টোলপ্লাজা পর্যন্ত রেল পথের ভাঙ্গা উপজেলার মালিগ্রাম, শিবচরের বাঁচামারা ও জাজিরার নাওডোবা সংলগ্ন এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে জংশন। ২০২২ সালের ১ নভেম্বর ভাঙ্গা থেকে পদ্মাসেতুর জাজিরা পর্যন্ত ৩১ কিলোমিটার রেলপথে পরীক্ষামূলক ‘ট্র্যাক কার’ চালানো হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলাটি ভৌগলিক দিক দিয়ে রাজধানী ঢাকার কাছে। পদ্মা সেতুকে ঘিরে নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে এই শিবচরে। সেতু চালুর পর শিবচর উপজেলার মানুষ রাজধানীর সঙ্গে দ্রুত সময়ে যোগাযোগ করতে পারছেন। তাতে করে এ এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি এসেছে।

এদিকে, পদ্মা নদীর বাংলাবাজার-শিমুলিয়া ঘাটের উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করা অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ তাদের দীর্ঘদিনের পেশা হারিয়েছেন। তবে রেলসংযোগ ঘিরে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন এসব মানুষরা।

রেলপথ সংলগ্ন শিবচরের দত্তপাড়া, পাঁচ্চর, কুতুবপুর, কাঁঠালবাড়ী এলাকার স্থানীয় লোকজন বলেন, পদ্মা সেতুর পর ট্রেন চালু হলে যোগাযোগের আরেক দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এই রেললাইন ঘিরে এই এলাকার মানুষ নতুন কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখছেন। তাছাড়া ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে রেলকে কেন্দ্র করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে কম খরচে মালামাল পরিবহন করা যাবে। একই সঙ্গে জেলায় উৎপাদিত কৃষি পণ্য সহজেই ঢাকাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। স্বল্প আয়ের মানুষ, শ্রমজীবীরা রেল কেন্দ্রিক নতুন কাজের সন্ধান পাবেন। জংশন এলাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসা বা হকারি করেও জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন তারা।

পদ্মা নদীর তীরে গড়ে ওঠা ঘাট বন্ধ হওয়ার পর শতশত মানুষ তাদের দীর্ঘদিনের পেশা হারিয়েছেন। অসংখ্য হকার শ্রেণির মানুষ আজ বেকার। তারাও রেল নিয়ে আশায় আছেন। নতুন করে জীবিকা নির্বাহের জায়গা তৈরি হবে এই রেলপথকে ঘিরে।

শিবচরের ব্যবসায়ী আবু সালেহ মুসা বলেন, ‘রেললাইন আমাদের এলাকার উপর দিয়ে পদ্মা সেতুতে গিয়ে মিশেছে। রেল চালু হলে আমরা অল্প খরচে সহজেই ঢাকা যেতে পারবো। মানুষের আয়-রোজগারের নানা পথ চালু হবে। এই এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে।’

কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহসেন উদ্দিন সোহেল বেপারী বলেন, ‘রেল চালু হলে অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসবে। মানুষের সমৃদ্ধি বাড়বে। নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হবে। তাছাড়া যোগাযোগের অভাবনীয় পরিবর্তন আসবে।’

সাবেক ছাত্র নেতা রকিবুজ্জামান রুবেল খান বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ স্বপ্নের পদ্মা সেতুর সুফল ভোগ করছে এখন। রাজধানী ঢাকা চলে এসেছে ঘরের নিকটে। রেল চালু হলে নতুন দিগন্ত খুলবে যোগাযোগের। রেল ঘিরেও স্বপ্ন এই অঞ্চলের মানুষের। আর শ্রমজীবীদের স্বপ্ন বেঁচে থাকার নতুন কাজের জায়গা তৈরির।’

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাঈদ আহমাদ বলেন, ‘আগামী মার্চ এপ্রিলের মধ্যেই ভাঙ্গা থেকে মাওয়া অংশের কাজ শেষ হবে। সব ঠিক থাকলে জুন মাসের মধ্যে যাতে এই অংশে ট্রেন চলতে পারে সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ চলছে। আমাদের স্টেশন নির্মাণ কাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে।’

গত ১০ জানুয়ারি পদ্মা রেল সেতুতে রেল ট্রাক কার নিয়ে অগ্রগতি পরিদর্শন করেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। মাদারীপুরের শিবচরের পদ্মা স্টেশন থেকে মন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রেল ট্রাক কারে চড়ে পদ্মা রেল সেতুর নির্মিত প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশ যান। অগ্রগতি কাজের পরিদর্শনের এসে সেসময় রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন জানান, এখন পর্যন্ত সার্বিক কাজের অগ্রগতি ৭৩ শতাংশ। জুনের মধ্যে ঢাকা-ভাঙ্গা রেল চলাচল শুরু হবে। ফরিদপুরের ভাঙা থেকে মাওয়া পর্যন্ত কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ভাঙা থেকে যশোর পর্যন্ত ৬০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। ঢাকা থেকে মাওয়া ৬৯ ভাগ পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে।

Back to top button